রাজশাহী অঞ্চলে বিলুপ্ত প্রায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি

মহিব্বুল আরেফিন | প্রকাশিত: ১৩ জানুয়ারী ২০২২ ১৫:২৮; আপডেট: ১৮ জানুয়ারী ২০২২ ১৫:৪১

ঢেঁকিতে চাল ভেঙ্গে আটা তৈরি করা হচ্ছে- ছবি: সংগ্রহীত, ইন্টারনেট।

পুর্ব আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৃথিবী সূর্যের আলোয় আলোকিত হবে। পাখির কিচিরমিচির ডাকে মুখরিত চারদিক। এমন এক স্বর্গীয় পরিবেশে বাড়ির আঙ্গিনায় ধুপধাপ শব্দ। কিছুক্ষণ পরেই মেয়েলি কন্ঠে ভেসে উঠে-

‘ধান ভাঙ্গিরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া
ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া-দুলিয়া
ও ধান ভাঙ্গিরে।’

অথবা

‘ও বউ ধান ভানে রে
ঢেঁকিতে পাড় দিয়া,
ঢেঁকি নাচে বউ নাচে,
হেলিয়া দুলিয়া
ও বউ ধান ভানে রে...।’


বিশেষত ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত আবহমান বাংলায় ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি প্রায় সকল গিরস্থ বাড়িতে থাকতো। কিন্তু যান্ত্রিকতার প্রভাবে এখন চোখে পড়ে না। আর রাজশাহী অঞ্চলে থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি। এক সময় ভোরের আজানের পর স্তব্ধতা ভেঙে ঢেঁকির শব্দ ছড়িয়ে পড়ত গাঁও-গ্রামের চারদিকে। গ্রামের মা চাচিরা একসাথে বসে নবান্নের আনন্দে মেতে উঠতেন। গ্রামের বিয়ে-শাদির উৎসবে ঢেঁকি ছাঁটা চালের ফিরনি-পায়েসের ফরমায়েশ ছিলো অপরিহার্য। সে সময় ঢেঁকি ছাড়া একদিনও গ্রামের জীবনযাত্রা কল্পনা করা কঠিন ছিল।

উৎসব-পার্বণে ধান থেকে আতপ চাল তৈরি করতে, পিঠা বানাতে, চালের গুঁড়ি তৈরিতে ঢেঁকি শিল্পে গ্রামের মহিলার ব্যস্ত সময় পার করতেন। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া বৃদ্ধা বা বয়স্ক মহিলারা গর্বের সাথে বলতেন ‘এই ঢেঁকি আমার দাদাশ্বশুরের আমলের’ বা ‘বাপের বাড়ীর ঢেঁকি নিয়ে গল্প শুরু করতেন।’ পাশাপাশি গ্রাম বাংলার ঘোমটা পরা বধূরা বিভিন্ন কায়দা-কসরতে ঢেঁকির তালে তালে বাপ-দাদার সময় থেকে চলে আসা গীত গেয়ে পরিবেশটি আনন্দঘন করে তুলতেন। কিন্তু যান্ত্রিক জীবন গ্রামীণ জনপদের এই কর্ম চঞ্চলতাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ধান ভাঙার মেশিনের ভট-ভট শব্দ ঢেঁকির মধুময় ছন্দকে গ্রাস করে নিয়েছে।

শিল্পের অপর নাম ঢেঁকি
ঢেঁকি একটি শিল্পের নাম। ঢেঁকির যৌবনে এর ব্যাপক কদর ছিল। একই সাথে সারা দেশে ঢেঁকি থেকে প্রকৃয়াজাত বিভিন্ন দ্রব্যের ব্যপক কদর ছিলো। সারাদেশে লাখ লাখ পরিবার সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তৎকালীন সময়ে ঢেঁকিতে চাল বারানীরা তাদের উৎপাদিত চাল বিক্রি করে সংসার খরচ মেটাতেন। পাশাপাশি উপার্জনকৃত অর্থ অন্যখাতে বিনিয়োগ বা সঞ্চয়ও করতেন। সময়ে পরিবর্তনে আধুনিক চাল মিলের প্রসারের কারণে ঢেঁকি শিল্পীদের অনেকেই অর্ধাহারে-অনাহারে দিনমজুরি, ইটভাটা, ভিক্ষাবৃত্তিসহ অনাকাঙ্খিত বিভিন্ন পেশা বেছে নিতে বাধ্য হন। তা ছাড়া আনেকেই কাঁথা সেলাই আবার কেউবা দর্জির কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন।

বিশেষত এক সময় দেশের লাখ লাখ বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত নিম্নবিত্ত পরিবারের মহিলারা সামাজিক স্বসম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন ছিলো গ্রামীণ ঐতিহ্যটি এই ঢেঁকি শিল্প। ফলে গ্রামীণ মহিলাদের কাছে এটি ছিল অতীব প্রয়োজনীয় একটি কর্মসহায়ক হাতিয়ার। আর অনেক অঞ্চলে গৃহস্থের বাড়িতে ঢেঁকির সংখ্যা দ্বারাই বিচার হতো কে কতো বড় গৃহস্থ।

যেভাবে তৈরি ঢেঁকি
ঢেঁকি সাধারণত বরই, বাবলা ও জামগাছের কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। আবার অনেকে শাল-গজার বা নিজের পছন্দের কাঠ দিয়ে ঢেঁকি তৈরি করতেন। কেউ কেউ ঢেঁকিতে খোদায় করা নকশা এঁকে নিতেন। এক সময় ঢেঁকি তৈরির জন্য খোঁজ পড়তো সুদক্ষ ছুতার মিস্ত্রী বা কাঠের কারিগর। আর ঢেঁকি মনঃপুত হলে তাদের বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত করার রেয়াজও ছিলো।

ঢেঁকিতে কাজ শেষে সাধারণত এভাবেই একটি কাঠ বা গাছের ডাল দিয়ে উচুঁ করে রাখা হতো- ছবি: সংগ্রহীত ইন্টারনেট।

ঢেঁকির বিবরণ
ঢেঁকি সাধারণত ভাবে সাড়ে তিন থেকে চার হাত দৈর্ঘ্য, আর পৌনে এক হাত চওড়া। যা প্রায় ৬ ফুট লম্বা ও ৯ ইঞ্চি ব্যাস বিশিষ্ট একটি গাছের ধড়। মেঝে থেকে ১৮ ইঞ্চি উচ্চতায় ধড়ের একেবারে সামনে দুই ফুট লম্বা একটি গোল কাঠ থাকে। আর এর মাথায় লাগানো থাকে লোহার পাত বা গুলা। এর মুখ যে নির্দিষ্ট স্থানে পড়ে সে স্থানকে গড় বলে। এই গড়ে ভেজানো চালে পাড় দিয়ে তৈরি করা হয় গুঁড়া বা বিভিন্ন উপকরণ। পেছনে দু’টি বড় কাঠের দন্ডের ভেতর দিয়ে একটি ছোট হুকড়া হিসেবে কাঠের গোলাকার খির থাকে। এভাবেই তৈরি করা হতো ঢেঁকি। ঢেঁকির সামনে অংশ ছুঁচালো বা চিকন এবং পেছনের অংশ চ্যাপ্টা আকৃতির। এই পেছন অংশেন মাটিতে একটি গর্ত করা থাকতো। যখন বধুরা ঢেঁকিতে উঠে পাপ দিতেন তখন সেই অংশ গর্তের মাঝে চলে যেতো। সাধারণত গ্রামের স্বচ্ছল বাড়িগুলোতে ঢেঁকিঘর হিসেবে আলাদা একটি ঘর থাকত। এ ঘরে ঢেঁকির পাশাপাশি ‘জাতা’ বা ‘জাতাকল’ থাকতো।

তখন গ্রামে মহিলাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত কে কতো ভোরে উঠে ঢেঁকিতে পাড় দিতে পারে বা বেশি ধান ভাঙ্গতে পারে। ঢেঁকির শব্দে কৃষকের ঘুম ভেঙে যেত। মহিলারা যখন ধান ভাঙ্গেন তখন তাদের হাতের চুড়ি কিংবা কাঁকনের ঝনঝন আর পায়ের নূপুরের শ্রুতিমধুর শব্দের সৃষ্টি হতো। এসময় উৎসবমুখোর পরিবেশে মা-খালারা গল্প-গুজোব করে নিজেদের সুখ-দুঃখ এক অপরের সাথে ভাগাভাগি করে নিতেন। এখন রাজশাহী অঞ্চলে এই ঢেঁকি নেই বললেই চলে। বর্তমানে ঢেঁকির গল্প শোনা যায় ৫০-৬০ উর্দ্ধের নানি-দাদিদের মুখে। তাদের ভাষ্য মতে, এক সময় অগ্রাহয়ন মাসে নতুন ফসল ঘরে তোলার পর এবং পৌঁষ সংক্রান্তিতে ঢেঁকির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠতো গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি। গৃহস্থ বাড়ির মহিলারা ঢেঁকির মাধ্যমে চাল তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় কাটাতেন।

দরিদ্র পরিবারের মহিলারা ঢেঁকিতে শ্রম দিয়ে আয়-রোজগারের পথ বেছে নিতেন। সেই সময় ঢেঁকিতে কাজ করাই ছিল দরিদ্র পরিবারের মহিলাদের আয়ের প্রধান উৎস। ঢেঁকি দিয়ে শুধু ধান থেকে চালই নয়, পিঠে-পুলি তৈরির জন্য চালের গুড়াও তৈরি করা হতো। পরিবারের নারীরা গম ও যব ভাঙার কাজ ঢেঁকিতেই করতেন। পাশাপাশি চিড়া তৈরির মতো কঠিন কাজও ঢেঁকিতেই করা হতো। বিশেষ করে শবে বরাত, ঈদ, পূজা, নবান্ন উৎসব, পৌষ পার্বণসহ বিশেষ বিশেষ দিনে পিঠা-পুলি খাওয়ার জন্য অধিকাংশ বাড়িতেই ঢেঁকিতে চালের আটা তৈরি করা হতো।

বিলুপ্তির কারণ
বর্তমানে রাজশাহীঅঞ্চলে থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঢেঁকি শিল্প। এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যায়- ‘বিশেষ করে সত্তরের দশকের পর ইঞ্জিনচালিত ধানভাঙা কল আমদানি শুরু হয়। নব্বই দশকে যান্ত্রিক কলটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে। মানুষ সময় এবং শ্রম উভয়টি বাঁচানোর জন্য যান্ত্রিক কলটির কাছে ছুটে যায়। দেখায় একজন ব্যক্তি একাই বস্তায় করে ধান বা চাল কলে হাজির হতেন। ১ থেকে ৩ টাকার বিনিময়ে একমন ধান অল্প সময়ে ভাঙ্গিয়ে নিতে পারতেন। অপর দিকে ঢেঁকিতে ধান বা চাল ভাঙ্গাতে অন্তত তিন থেকে চারজন মাহিলার প্রয়োজন পড়ে। আবার এক মন ধান ভাঙ্গার শেষ করতে সময় লাগতো ঘন্টা কয়েক। আবার মানুষের কর্মব্যস্ততা বেড়ে যাবার কারণে একসাথে তিন চার জন মাহিলা পাওয়া দুরহ হয়ে যায়। এসব কারণে রাজশাহীর গ্রামাঞ্চল থেকে ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দও একসময় হারিয়ে যায়। এমন কি গেরস্থের বাড়ী থেকেও ঢেঁকি বের করে দেয়া হয়।

বর্তমানে নতুন প্রজন্মের কাছে অপরিচিত এক নাম গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি। তবে তাদের কাছে এর কার্যকারিতা পরিচিত না হলেও প্রবাদ-প্রবচনে ‘ঢেঁকি’ শব্দটি কিছুটা হলেও পরিচিত। এদিকে অন্যান্য পুরাকৃর্তির সাথে একসময় হয়তো জাদুঘরে ঠাঁয় হবে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকির। আর ভবিষ্যত প্রজন্ম ঢেঁকি দেখে চোখের ক্ষুধা মেটাবেন আর শিক্ষার্থীরা ‘ঢেঁকি’ কে গবেষণার উপকরণ হিসেবে হয়তো ব্যবহার করবেন।

 



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top