29662

01/17/2026 রাজশাহীতে এলপিজি গ্যাসের ভয়াবহ সংকট

রাজশাহীতে এলপিজি গ্যাসের ভয়াবহ সংকট

শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন

১৭ জানুয়ারী ২০২৬ ১৮:০৪

রাজশাহীতে গত তিন সপ্তাহ ধরে এলপিজি গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে গৃহস্থালির রান্না থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্তোরা সবখানেই স্থবিরতা নেমে এসেছে। রাজশাহীতে দৈনিক ৩৫ থেকে ৪০ হাজার এলপিজি সিলিন্ডারের প্রয়োজন। সেখানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৮ হাজার বা তার থেকেও কম সিলিন্ডার। ফলে সরকারী নির্ধারিত দামের চেয়ে দ্বিগুণ মূল্য দিয়েও মিলছে না এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার।

রাজশাহী মহানগরীতে গত ৪ জানুয়ারি থেকে এলপিজি গ্যাস সংকট শুরু হয়। আর পরদিন ৫ জানুয়ারী সকাল থেকে বাড়তি দাম দিয়েও বাজারে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যায়নি। রাজশাহী মহানগরীর জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ১৩ হাজার ৮৬৭ জন এবং জেলার জনসংখ্যা ৩০ লাখ ২৩ হাজার ১৭৮ জন। মহানগরী ও জেলা মিলিয়ে মোট পরিবারের সংখ্যা ৭ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৫টি। এর মধ্যে মহানগরীতে পাইপলাইনে গ্যাস সংযোগ রয়েছে মাত্র ৯ হাজার ১৫৭টি বাসাবাড়িতে। বাকি বিপুল সংখ্যক পরিবার সম্পূর্ণভাবে এলপিজি সিলিন্ডার নির্ভর। পাশাপাশি নগরীর প্রায় সব হোটেল ও রেস্তোরায় এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়। এদিকে রাজশাহীতে মোট ১৮টি কোম্পানি এলপিজি গ্যাস সরবরাহ করলেও বর্তমানে কার্যত সক্রিয় রয়েছে মাত্র ৪টি কোম্পানি। তবে বর্তমানে শুধুমাত্র এমবি, সান, যমুনা ও আই গ্যাস মিলে মোট ৪টি কোম্পানির সিলিন্ডার আসছে তাও সীমিতভাবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর অধিকাংশ খুচরা বিক্রেতার কাছে সিলিন্ডারের মজুত নেই বললেই চলে। কোথাও পাওয়া গেলেও তা কিনতে হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে। অনেক ক্ষেত্রে সিলিন্ডার পেতে দোকানিকে এক সপ্তাহ আগেই অর্ডার দিতে হচ্ছে। নগরীর ছোট বনগ্রাম এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, “৩ জানুয়ারি গ্যাস শেষ হয়। তিনটি বাজার ঘুরেও সিলিন্ডার পাইনি। দুই দিন পর ২ হাজার ৩৫০ টাকা দিয়ে একটি সিলিন্ডার জোগাড় করতে হয়েছে। মাঝের দুই দিন রান্না হয়নি।”

বালিয়াপুকুর এলাকার এক বাসিন্দা জানান, পরিচিত ডেলিভারি কর্মী গ্যাস না থাকায় বেশি টাকা দিলে সাহেববাজার থেকে এনে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। “বাধ্য হয়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনেছি। এদিকে গতকালও বাজারের বিভিন্ন দোকানে সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে ক্রেতারা ফেরত আসেন। এতে করে বাড়ির গৃহীনিরা চরম বিপাকে পড়েন। এছাড়া নগরীর হোটেল রেস্তোরা গুলো পুরোটাই এলপিজি সিলিন্ডার নির্ভর। আর এলপিজি সংকটের বিরুপ প্রভাব পড়েছে রাজশাহীর হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়। হোটেল ব্যবসায়ীরা জানান, মাঝারি দোকান গুলোতে “প্রতিদিন চারটি বড় সিলিন্ডার লাগে। বড় সিলিন্ডার কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তারা ছোট সিলিন্ডার দিয়ে কোনোমতে রান্না চালাচ্ছেন। আবার অনেক রেস্তোরাতে বিভিন্ন আইটেম বন্ধ রাখতে হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান।”

খুচরা গ্যাস বিক্রেতারা গ্যাস সংকটের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থার অনিয়মকে দায়ী করছে। তাদের মতে, “চাহিদার তুলনায় খুব কম সিলিন্ডার পাচ্ছেন। ফলে ক্রেতারা মনে করছেন তারা মজুত করছে। গ্রেটার রোড এলাকার বড় এজেন্সি মেসার্স হালিমার ব্যবস্থাপক পারভেজ হোসেন জানান, “আগে প্রতিদিনই ট্রাক আসত। এখন সপ্তাহে এক-দুই দিন আসে, তাও অল্প পরিমাণে। ফলে কাউকেই চাহিদামতো গ্যাস দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।” তারা আরও বলেন, গত ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সোয়া ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৫৩ টাকায়। জানুয়ারি থেকে সরকার নির্ধারিতভাবে দাম বেড়ে হয় ১ হাজার ৩০৬ টাকা। “দাম বাড়ার পর থেকেই সরবরাহ আরও কমে গেছে। ডিলারদের একটি সূত্র বলছেন, গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই দাম বাড়বে এই অজুহাতে কোম্পানিগুলো সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে আনে, যা এখন আরও সংকুচিত হয়েছে।

ওমেরা কোম্পানির পরিবেশক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, “আগে প্রতিদিন যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যেত, এখন সপ্তাহে মাত্র দুই দিন পাওয়া যাচ্ছে। আজ যা এসেছে, সবই বিক্রি হয়ে গেছে।” রাজশাহী এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবসায়ী সমিতি জানায়, “রাজশাহীতে দৈনিক ৩৫ থেকে ৪০ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা, অথচ সরবরাহ হচ্ছে পাঁচ ভাগের এক ভাগ। এলপিজি সংকট কবে স্বাভাবিক হবেএ প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত উত্তর দিতে পারছেন না কেউই। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় দ্রুত সরকারি তদারকি ও সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ না নিলে রাজশাহীর রান্নাঘর ও খাদ্য ব্যবসা আরও বড় সংকটে পড়বে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
 

প্রকাশক ও সম্পাদক : মহিব্বুল আরেফিন
যোগাযোগ: ২৬৮, পূবালী মার্কেট, শিরোইল, ঘোড়ামারা, রাজশাহী-৬০০০
মোবাইল: ০৯৬৩৮ ১৭ ৩৩ ৮১; ০১৭২৮ ২২ ৩৩ ২৮
ইমেইল: [email protected]; [email protected]