29798

02/05/2026 নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ইশতেহার ঘোষণা জামায়াতের

নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ইশতেহার ঘোষণা জামায়াতের

রাজ টাইমস ডেস্ক

৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:০৮

একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গিকারে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আজ সন্ধ্যায় নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। এতে আগামী পাঁচ বছর সরকার পরিচালনায় ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং আট ভাগে ৪১ দফা প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।

আজ ৪ ফেব্রুয়ারি বুধবার বনানীর শেরাটন হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ইশতেহার ঘোষণা করেন। উপস্থিত আছেন বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকবৃন্দ, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সিনিয়র সাংবাদিক, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পেশার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ।

জামায়াতে ইসলামী আগামী পাঁচ বছরের সরকার পরিচালনায় ২৬ বিষয় অগ্রাধিকারের কথা বলা হয়েছে:

এক. ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন; দুই. বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন, যুবকদের ক্ষমতায়ণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া; চার. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন; পাঁচ. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ; ছয়. সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন; সাত. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন; আট. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ; নয়. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক যাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ; দশ. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা; এগার. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় হওয়া বুন, গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা; বার. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে; তের. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা; চৌদ্দ. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং 'তিন শূন্য ভিশন (পরিবেশগত শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা), বাস্তবায়নের মাধ্যমে 'সবুজ ও বাংলাদেশ গড়া; পনের. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি; ষোল. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ, সৃষ্টি করা; সতের. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; আঠার. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়; বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা; উনিশ. আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা; বিশ. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা; একুশ. দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেবে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যানা মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা; বাইশ. যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সাথে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও চাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা; তেইশ. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আব্যস্থন নিশ্চিত করা; চব্বিশ. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা; পঁচিশ. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; ছাব্বিশ. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

নির্বাচনি ইশতেহারের ভূমিকায় বলা হয়, উর্বর ভূমি, বিপুল তরুণ জনশক্তি, সহনশীল ও উদার জনগোষ্ঠী এবং সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে এক অপার সম্ভ সম্ভাবনার দেশ। জনসংখ্যার দিক থেকে এটি বিশ্বের অষ্টম এবং যুলসিন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আগমনের আগে মুঘল সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের রায় অর্থনৈতিক শক্তি। আর বাংলা ছিল সেই সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশ।

১৯৪৭ ৬৯৫৯ সালে বাংলার মানুষ পরপর দু'বার স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অসৎ, দুর্নীতিগ্রত অগণতান্ত্রিক নেতৃত্বের কারণে সেই স্বাধীনতা অর্থবহ হয়ে ওঠেনি। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে যে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা হয়েছিল, গত পনেরো বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনবাবস্থায় বা সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এই সময়ের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করা হয়েছে। দেশের ৫৭ জন দেশপ্রেমিক সেনা অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে সার্বিকভাবে দেশকে এক বিভীষিকাময় টর্চারসেলে পরিণত করা হয়েছিল। হাজার হাজার মা তাদের সন্তান হারিয়েছেন। অসংখ্য পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে। লাখো হামলা-মামলায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের জীবন চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছিলা প্রায় সব বিরোধী রাজনৈতিক দল, মত ও সংগঠন জুলুমের শিকার হয়েছে।

এই সময়েই দেশের অর্থনৈতিক খাত গভীর সংকটে নিপতিত হয়। লুটপাট ও অর্থ পাচার বাড়তে থাকো ব্যাংকবাত ধ্বংসের পথে যায়। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দ্রুত বিস্তৃত হয়। সব মিলিয়ে আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ একটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক পতনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। এর ফলশ্রুতিতে আজ দেশের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

সেই নিকষ অন্ধকার কেটে জাতীয় ঐক্যের মধ্য দিয়ে তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত জুলাই বিপ্লব এক নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। শহীদ আবু সাঈদ থেকে শহীদ শরীফ ওসমান হাদীসহ হাজারো তরুণ জীবন উৎসর্গ করেছে একটি ফ্যাসিবাদবিহীন, স্বাধীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নো তাদের আত্মত্যাগ দেশের গণতন্ত্র, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে এক নতুন সকালের ইঙ্গিত দিয়েছে।

বহু দশক ধরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে সৎ, যোগ্য ও সুশৃঙ্খল মানুষ গড়ে তুলতে। আওয়ামী শাসনের ১৫ বছরে জামায়াতে ইসলামী দেশের সবচেয়ে নিপীড়িত রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়েছিলা দলের শীর্ষ নেতৃত্বসহ অগণিত কর্মী ও সমর্থক ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তবুও জামায়াত নেতৃত্ব কখনো প্রতিহিংসার রাজনীতির পথে যায়নি। বরং তারা সবসময় দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সংযম, ধৈর্য ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তারা অব্যাহত রেখেছো

এখনই সময় বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলারা তরুণ সমাজকে সঙ্গে নিয়ে একটি নিরাপদ, মানবিক, ইনসাফভিত্তিক, সমৃদ্ধ, উন্নত ও শক্তিশালী বাংলাদেশের পথে যাত্রা শুরু করার। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘ গবেষণা ও গভীর চিন্তাভাবনার ভিত্তিতে একটি আধুনিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা প্রস্তুত করেছে।

এই ইশতেহার একটি পরিকল্পিত, দূরদর্শী ও বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি। এটি চটকদার, মনভোলানো বা অবাস্তব প্রতিশ্রুতির দলিল নয়া এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাস্তবায়নযোগ্য স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ওপর। এর ভিত্তি হিসেবে রয়েছে স্বচ্ছ, গতিশীল ও যোগ্য নেতৃত্ব, দক্ষ ও সৎ কর্মীবাহিনী, সুস্পষ্ট উন্নয়ন লক্ষ্য এবং জনকল্যাণকেন্দ্রিক নীতি।

দেশের সকল ধর্ম, অঞ্চল, নারী-পুরুষ ও শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একতা, মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়েই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আজ জাতির সামনে উপস্থাপন করছে একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার।

প্রকাশক ও সম্পাদক : মহিব্বুল আরেফিন
যোগাযোগ: ২৬৮, পূবালী মার্কেট, শিরোইল, ঘোড়ামারা, রাজশাহী-৬০০০
মোবাইল: ০৯৬৩৮ ১৭ ৩৩ ৮১; ০১৭২৮ ২২ ৩৩ ২৮
ইমেইল: [email protected]; [email protected]