02/05/2026 সকল ধর্মের মানুষদের নিয়ে বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গিকার
শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:৪৬
সকল ধর্মের মানুষদের নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গিকার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘রাজশাহীতে দুই ধরণের উন্নয়ন হয়েছে। কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন- স্কুল-কলেজ, ইউনির্ভাসিটি, সামাজিক ও ব্যবসায়ীক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ঘর-বাড়ী, রাসÍাঘাট এর উন্নয়ন হয়েছে। আবার গত ৫৪ বছরে উন্নয়ন হয়েছে দুর্নীতি আর চাঁদাবজীর। উন্নয়ন হয়েছে মানুষের হ্ক নষ্ট করার, উন্নতি হয়েছে ব্যাংক ডাকাতি করার, উন্নতি হয়েছে শেয়ার মার্কেট লুট করার, উন্নয়ন হয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পথে বসানোর, উন্নয়ন হয়েছে নিজেদের কপাল কিসমতের জন্য বাংলাদেশের টাকা বিদেশে পাচার করার। এই দুই ধরণের উন্নয়ন সারাদেশে হয়েছে, এখানেও হয়েছে। আমরা এক ধরনের উন্নয়ন চাই, দুই ধরনের উন্নয়ন চাইনা। আমরা চাই জনগনের উন্নয়ন। আমার চাই সে দেশ যেখানে শান্তিতে বসবাস করতে পারবো। আমরা সকল ধর্মের মানুষদের বুকে ধারণ করে বাংলাদেশ করতে চাই’।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় রাজশাহী নগরীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথি বক্তব্যে তিনি এসবকথা বলেন। প্রায় লক্ষ লোকের সমাবেশে রাজশাহীর এই সমাবেশ থেকে আমিরে জামায়াত দেশ ও জাতির চলমান সংকট, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা, সুশাসন, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি জাতির বাক পরিবর্তন এবং জাতিকে সঠিক পথে উঠানোর নির্বাচন। আমরা আগামীতে একটা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেরা দুর্নীতি করব না এবং কোনো দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয়ও দেব না। রাজশাহী মহানগর জামায়াতের আমির ও চাঁপাই নবাবগঞ্জ শিবগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ড. মাওলানা কেরামত আলীর সভাপতিত্বে ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন,‘ আমরা জাতিকে আর বিভক্ত করতে দেবোনা। আমরা ঐক্যবদ্ধ জাতি নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। এজন্য আমাদের ১১ দলের স্লোগান হচ্ছে ঐক্যবব্ধের বাংলাদেশ। আমাদের কথা সাফ আমরা আল্লাহর কাছে ও জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ, জনগনের রায়ের মাধ্যমে ভোটের মাধ্যমে যদি দেশ পরিচালনার সুযোগ দেন তবে ইনশাল্লাহ আর কাউকে চাঁদাবাজী করতে দেবোনা। ইনশাল্লাহ এদেশে আর কারো দুর্ণীতি করার সুযোগ থাকবেনা। এই দেশে রাজার ছেলে রাজা হবে বংশানুক্রমিক পরিবার তান্ত্রিক রাজনীতি এই দেশে আর চলবেনা। রাজনীতি হবে মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে, রাজনীতি হবে দেশপ্রেম প্রমাণের মাধ্যমে, এদেশে আধিপত্ব্য কোন রাজনীতি আর চলবেনা। প্রতিবেশীসহ সারা দুনিয়ার সাথে আমাদের চমৎকার সম্পর্ক থাকবে। সেই সম্পর্ক হবে সমতা এবং মর্যদার ভিত্তিতে। অমর্যদাকর কোন সম্পর্ক কোন দেশের সাথে রাাখতে চাইনা। আমরা মাথা উচু করে দাঁড়াতে চাই। এ জন্য সোনা সন্তানেরা সেদিন গুলিকে পরোয়া করেনাই।
জনসভায় রাষ্ট্র পরিচালনায় জামায়াতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দেশের প্রতিটি শিশুর শিক্ষার ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহন করবে। প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষাই হবে জাতি গঠনের প্রধান হাতিয়ার। তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা বেকার ভাতা চায়নি, তারা চেয়েছে কাজের অধিকার।’ যুবসমাজকে আশ্বস্ত করে তিনি জানান, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে তরুণদের সঠিক শিক্ষা ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এরপর তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে যোগ্য ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য নয়, বরং যোগ্যতা ও দেশপ্রেমই হবে একমাত্র মাপকাঠি। একই সঙ্গে তিনি সবার ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। পর্যটন শিল্পের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, অবহেলা ও দুর্নীতির কারণে দেশের পর্যটন খাত আজ ধ্বংসের মুখে। ক্ষমতায় গেলে রাজশাহীর প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
রাজশাহী মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি সমাজ উদ্দিন মন্ডল এবং জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি গোলাম মোর্তজার যৌথ সঞ্চালনায় জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জাময়াতে ইসলামী রাজশাহী মহানগরীর আমির ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. মাওলানা কেরামত আলী। এতে জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, এনসিপি নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতুসহ ১১ দলীয় জোটের নেতারা বক্তব্য রাখেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, জামায়াতের নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের সংসদ প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।
আমীরে জামায়াত মানবিক, বৈষম্যহীন, ন্যায় এবং ইনসাফের ভিত্তিতে বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে বলেন, যে বাংলাদেশে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা-নারী-পুরুষ সকলেই নিরাপত্তা এবং মর্যদার সাথে বসবাস করবেন। যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী পেশাগত দ্বায়িত্ব পালন করবেন। এখানে ধর্মের ভিত্তিতে কারো পেশাগত মর্যদা বৃদ্ধি পাবেনা। মর্যদা পাবে যোগ্যতা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে। এই দুইটা জিনিস যার মধ্যে পাওয়া যাবে কাজ অটোমেটিক্যালী তার হাতে চলে যাবে। তিনি আরও বলেন, প্রত্যেকটি বিভাগী নগরী প্রত্যেকটি জেলা কেন্দ্রে মেডিকেল কলেজ কায়েম করবো এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তুলবো। আর যে সমস্ত জায়গায় শ্রমঘন জায়গা সে সব স্থানে শ্রমজীবিদেও জন্য আলাদা বিশেষায়িত হাসপাতাল হবে। তারা যাতে সেবা নিতে গিয়ে কোন ধরণের সমস্যায় না পড়েন। আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে তিনি জনগণকে বিভেদ ভুলে ইনসাফ ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। দুর্নীতিমুক্ত ও শোষণহীন বাংলাদেশ গড়তে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার মধ্য দিয়েই জনগণের মুক্তি নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে পুরানা রাজনীতিকে লাল কার্ড, নতুন বাংলাদেশ। যে রাজনীতি মানুষ খুন করে, যে রাজনীতি আয়না ঘর তৈরি করে, দেশ প্রেমিক নেতাদের খুন করে, আমার দেশের সমস্ত সম্পদ লুট করে, যে রাজনীতি ব্যবসায়ে রুপান্তর হয় সেই রাজনীতিকে আগামী ১২ তারিখ ইনশাল্লাহ্ লাল কার্ড। প্রথম ভোট ‘হ্যাঁ’ ভোট আর দ্বিতীয় নিয়ে বলেন আমিরে জামায়াত বলেন, যার অতীতেও খাসলত খারাপ ছিলো এখনও যারা লোভ সামলাতে পারেনি সেই বিড়ালের হাতে গোস্ত পাহারা দেয়ার দ্বায়িত্ব দিবেন কি না প্রশ্ন রেখে বলেন, এরা রাষ্ট্রের-জনগণের মান, জাত এবং ইজ্জতের নিরাপত্তা এরা দিবে? এখনই দিচ্ছেনা তখন দিবে? দিবেনা। আফসোস। তারাও মজলুম ছিলেন কিন্তু কেন যে এখন বদলে গেলেন বুঝতে পারলামনা এবং বিভিন্নজাগার দখলদ্বারিত্ব নিতে গিয়ে নিজেদের ২৩৪ জন শেষ।
এরপরে আমাদের এখন গালি শুরু হয়েছে। যাদের মানুষ মারা গেল, চাঁদাবাজি করেনা, যারা কাউকে কষ্ট দেয়না, যারা দুর্ণীতি করেনা, মামলা বাণিজ্য করেনা, বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের হয়রান করেনা তাদের এখন বলা হচ্ছে জালেম। এদেও বলবো চোখ মেলে দেখেন জনগণ আপনাদের কি ভাবে দেখে। যুবক-নারীদেরে উত্থান দেখে তাদের মাথা গরম হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাথা গরম করবেন না। তরুণরা ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে লাল কর্ড দেখিয়ে দিয়েছে। আগামী ১২ তারিখও হবে ফ্যসিবাদের বিরুদ্ধে লাল কার্ড। রাজশাহীর সমস্য তুলে ধরে বলেন, এখানে একটি বহু পুরানা মেডিকেল কলেজ আছে। তার একটি ডেন্টাল ইউনিট করা হয়েছে কিন্তু ডেন্টাল কলেজ স্থাপন করা দরকার। এর উদ্যোগ নেয়া হলেও এটা ঘুমিয়ে পড়েছে। আমরা দেশ সেবার সুযোগ পেলে খুঁজে খুঁজে বের করবো সেবা দেয়র জন্য কোথায় কি দেয়া দরকার। ডেন্টাল কলেজ কে জাগিয়ে তুলবো, সুগার মিল লোকশানী কিন্তু কেন? চুরিচামারির জন্য। শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সোয়া তিন বছর শিল্প মন্ত্রনালয়ের দ্বায়িত্ব পালন করেছিলেন। তখন বন্ধ, মৃতপ্রায় মিল-কারখানা, সুগার মিলসহ একটা একটা করে তালা খুলতে শুরু করেছিলেন। এক বছরের মাথাই সেই প্রতিষ্ঠান গুলোকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন। চুরি বন্ধ হবার কারণে এটা সম্ভব হয়েছিলো। ইনশাল্লাহ যদি আপনাদের রায়ের প্রতিফলন ঘটে ১৩ তারিখ থেকে বলা লাগবেনা।
এদিন থেকে অনেকের নাখ এবং কান খাড়া হয়ে যাবে। বাংলাদেশ নতুন রাস্তা খুঁজে পাবে ইনশাল্লাহ। রাজশাহীতে সিএনজির সরবরাহের বিষয়ে বলেন, সমুদ্রে সম্পদ আহরণ শুরু হয়নি এখনও উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা কারো চোখ রাঙ্গানীর পরোয়া করবোনা ইনশাল্লাহ। দেশের সম্পদ দেশের মানুষের জন্য তুলে সর্বত্বক চেষ্টা করা হবে। তখন দেশের চাহিদা সব জায়গাতে পূরণ করা যাবে। এসময় তিনি রাজশাহীর ছয়টি আসনের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন। সমাবেশ শেষে ‘জনসেবক’ এ্যপ্সের উদ্বোধন করেন জুলাই আন্দোলনে শহীদ সাফি আঞ্জুম ও শহীদ আলী রায়হানের পিতাসহ ৬টি আসনের প্রার্থীগণ। উল্লেখ্য, মাদ্রাসা মাঠের নির্বাচনি সমাবেশে রাজশাহী মহানগর ও জেলার ৭টি উপজেলার নেতাকর্মী যোগ দেন। প্রায় ৬০ হাজার নারী কর্মীসহ দেড় লক্ষাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সকালে নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং দুপুরে রাজশাহীর গোদাগাড়িতে জনসভায় বক্তব্য দেন।