30270

04/16/2026 বিএমডিএ'র খাল খননে বদলেছে সেচব্যবস্থা

বিএমডিএ'র খাল খননে বদলেছে সেচব্যবস্থা

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:০৪

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ)) আধুনিক সেচ ব্যবস্থায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কৃষি বদলে গেছে। খাল খননের জন্য জেলার কৃষি পেয়েছে নতুন মাত্রা।
 
সদর উপজেলার গণশাপাড়া বাসিন্দা জুবাইয়ের হোসেন (৬৫)বলেন, বিএমডিএ যত আধুনিক প্রযুক্তিতে পানি সেচব্যবস্থা চালু করছে, এতে করে আমাদের কৃষিতে নতুন বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে। পুকুর খনন করে উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ছে। খাল খনন করে নদী থেকে পানি এনে জমিতে সরবরাহ করার ব্যবস্থায় বদলে যাচ্ছে আধুনিক কৃষি। গাছ রোপন ও খাল-খননে অন্যদের চেয়ে অভিজ্ঞায় এগিয়ে রয়েছে বিএমডিএ। তাদের এ ধরনের কাজ আরো বেশি দিলে এই এলাকায় আরো বেশি উন্নয়ন হবে বলে মনে করি।
 
একই উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল মাতিন (৫০) বলেন, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় কৃষি ও পরিবেশগত বিবর্তনে এক বিপ্লব ঘটিয়েছে বিএমডিএ। এক সময় এই জেলা ছিল অত্যন্ত শুষ্ক এবং কৃষির জন্য অনুপযোগী। বিএমডিএ’র প্রচেষ্টায় আজ তা দেশের অন্যতম প্রধান শস্য ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। ১৯৮৫ সালে অত্র অঞ্চলে বরেন্দ্র প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও ১৯৯১-৯২ সনে বিএনপি সরকারের আমলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিএমডিএ নামে এই সরকারী প্রতিষ্ঠান জন্ম লাভ করে।
 
তিনি আরো বলেন, খাল খনন ও চারা রোপনের যে পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারে রহমান, তার অত্যান্ত প্রশংসনীয়। উত্তরের মাটি, পানি ও কৃষকের সাথে যেহেতু বিএমডিএ'র সম্পর্ক বেশি তাই তাদের দিয়ে খাল খনন ও গাছ লাগানোর কাজটি ন্যাস্ত করলে ফল বেশি মিলবে বলে মনে করি।
 
চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন কার্যালয় থেকে জানা যায়, বিএমডিএ বরেন্দ্র এলাকার মরু প্রায় জমিকে সেচের আওতায় এনে চাষযোগ্য করার জন্য১৬৩৯টি ফোর্স মোড পাম্প স্থাপন করেছে।  ফলে যেসব জমিতে আগে বছরে মাত্র একটি ফসল হতো, সেখানে এখন প্রতি বছর প্রায় ৬২০০০ হেক্টর জমিতে তিনটি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে এবং এতে প্রায় ১,৩২,০০০ কৃষক পরিবার উপকৃত হচ্ছে। শুধু মাটির নিচের পানি নয়, বরং নদী ও খালের পানিকে পাম্পের মাধ্যমে তুলে সেচ কাজে ব্যবহারের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে এবং অদ্যাবধি ৮৮টি এলএলপি মহানন্দা নদী, পুনর্ভবা নদী ও বিভিন্ন খালে স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৩০০০ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করেছে এবং প্রায় ১২০০০টি কৃষক পরিবার উপকৃত হচ্ছে।বিএমডিএ’র সেচযন্ত্রের আওতায় প্রতি বছর ৬,৫০,০০০ মে:টন ফসল উৎপাদন হয় যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ১৬২৫ কোটি টাকা। সকল সেচযন্ত্রে সেচ কাজে পানির অপচয় রোধে এবং কৃষকদের বিল পরিশোধ সহজ করতে বিএমডিএ প্রথম স্মার্ট কার্ড ভিত্তিক প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা চালু করে, যা কৃষি খাতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
 
 
বরেন্দ্র এলাকার মরুময়তা রোধ এবং জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় বিএমডিএ সড়ক/রাস্তার দুই পাশে, পুনঃখননকৃত খালের ও পুকুর পাড়ে এবং পতিত জমিতে প্রায় ১.৫০কোটি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করেছে। এটি এলাকার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ২৩০ কিঃমিঃ খাস মজা খাল এবং ১০৯১ টি পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে। এতে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ কমছে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাচ্ছে। এছাড়া খরা মৌসুমে কৃষকেরা পুকুর হতে সমপূরক সেচ সুবিধা গ্রহণ করছে। কৃষি ও পরিবেশের পাশাপাশি বিএমডিএ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নেও কাজ করেছে। বিএমডিএ সেচের গভীর নলকুপ হতে ২৩৪ টি সুপেয় খাবার পানি সরবরাহ স্থাপনা নির্মান করেছে। ইহাতে অত্র জেলায় প্রায় দুই লাখ মানুষের খাবার পানি নিশ্চিত হয়েছে।বিএমডিএ কর্তৃক প্রায় ১৪০০ কিঃমিঃ বারিড পাইপের সেচ নালা নির্মাণের পাশাপাশি ওই এলাকায় যাতায়াতের জন্য প্রায় ১৮৬ কিঃমিঃ সংযোগ পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, যার ফলে কৃষকরা সহজেই তাদের পণ্য বাজারে নিতে পারছেন।সেচ সম্প্রসারণ আগে বরেন্দ্র এলাকার উঁচু জমিতে আম বাগান করা কঠিন ছিল। বিএমডিএ-র গভীর নলকূপের ফলে এখন বাগানগুলোতে নিয়মিত সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, যা ফলন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক জায়গায় পানির অপচয় রোধে ফোঁটা ফোঁটা সেচ বা ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতি জনপ্রিয় করতে বিএমডিএ কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। এর ফলে বরেন্দ্র এলাকায় ধান, গম,সরিষা, ভুট্টা এবং আম উৎপাদনের যে জোয়ার এসেছে, তা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিএমডিএ বড় ভূমিকা রাখছে।
 
চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন কার্যালয় প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন আল রশিদ জানান, চলতি বছরে বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষ মহানন্দা নদীর পানি উঁচু বরেন্দ্র অঞ্চলে নদী হতে প্রায় ১৭-১৮ কিঃমিঃ দুরে প্রায় ৮০-৯০ ফুট উঁচু  প্রায় ১৮০০০ হেঃ তীব্র পানি সংকট এলাকায় পানি সরবরাহসহ চাষাবাদের জন্য ২টি প্রকল্প প্রস্তাব কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছে । যার একটি হলো ”ডাবল লিফটিং পদ্ধতিতে মহানন্দা নদীর পানি সেচ কাজে ব্যবহার ও পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্প” এবং এর সম্ভাব্য প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৩৯ কোটি টাকা। অপর প্রকল্পটি হলো “জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব প্রশমনে মহানন্দা নদী হতে ভূ-পরিস্থ পানি সরবরাহের মাধ্যমে খরা প্রবণ বরেন্দ্র এলাকায় সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ প্রকল্প”এবং এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৮৭ কোটি টাকা।এই ২টি প্রকল্পের আওতায় নদীতে স্থায়ী পাম্প স্টেশন স্থাপনসহ প্রায় ২১০ কিঃমিঃ খাস খাল/খাড়ী ও ১৫০ টি খাস পুকুর পুনঃখনন , প্রায় ৫.৫০ লক্ষ বৃক্ষ রোপন ,২৭৫টি সোলার সেচ যন্ত্রপাতি স্থাপন,৩৩৫ কিঃমিঃ বারিড পাইপ লাইন নির্মান ও অন্যান্য কাজ করা হবে। এছাড়া বর্তমানে চলমান ২টি প্রকল্পের আওতায় অত্র জেলায় ৬কিঃমিঃ খাল,২টি বিল (বিল চুড়ইল ১১৫ একর, বিল কালন ১২৭ একর) ও ১৪৫ টি পুকুর পুনঃখননের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বর্তমান সরকার যদি এই প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী করে তাহলে অত্র এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিএমডিএ আরো ভূমিকা পালন করতে থাকবে।
 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. ফারহাত তাসনীম জানান, যে প্রতিষ্ঠান যে কাজের বিষয়ে পারদর্শী তাকে সেই ধরণের কাজ বেশি দিলে উদ্দেশ্য সফল হবে। এতে রাষ্ট্রের উন্নয়ন সহজীকরণ হবে। বিএমডিএ যদি কৃষি নিয়ে কাজ করে, তবে তাদের সে বিষয়ে ব্যবহার করা উচিত।
প্রকাশক ও সম্পাদক : মহিব্বুল আরেফিন
যোগাযোগ: ২৬৮, পূবালী মার্কেট, শিরোইল, ঘোড়ামারা, রাজশাহী-৬০০০
মোবাইল: ০৯৬৩৮ ১৭ ৩৩ ৮১; ০১৭২৮ ২২ ৩৩ ২৮
ইমেইল: [email protected]; [email protected]