30865

07/10/2026 ১০ জুলাইয়ে ‘বাংলা ব্লকেড’ উত্তাল রাজশাহী

১০ জুলাইয়ে ‘বাংলা ব্লকেড’ উত্তাল রাজশাহী

শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন

১০ জুলাই ২০২৬ ১৫:০২

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ১০ জুলাই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা দেশব্যাপী ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির প্রভাবে রাজধানীর মতোই উত্তাল হয়ে ওঠে রাজশাহী।

সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি), রাজশাহী কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজারো শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসেন। দিনভর ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ অবরোধের ফলে কার্যত অচল হয়ে পড়ে পুরো রাজশাহী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১০ জুলাই ছিল এমন একটি দিন, যেদিন রাজশাহীর আন্দোলন কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ধীরে ধীরে তা বৃহত্তর রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এই ধারাবাহিকতা জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

মহাসড়ক ও রেলপথে হাজারো শিক্ষার্থীর অবস্থান
সকাল থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও বিভাগ থেকে মিছিল বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক অতিক্রম করে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন রাজশাহী কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরাও। একই সময় গুরুত্বপূর্ণ রেললাইনেও অবস্থান নেওয়ায় কয়েক ঘণ্টার জন্য ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়।

অবরোধের কারণে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত যানবাহনসহ প্রায় সব ধরনের পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার নতুন অধ্যায়
১০ জুলাইয়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল আন্দোলনে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির দৃশ্যমান সম্পৃক্ততা। শুরুতে সম্পূর্ণ শিক্ষার্থী-নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলনে ওইদিন থেকে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে একাত্মতা ঘোষণা করতে শুরু করেন।

প্রথমে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। যদিও আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হাতে, তবুও রাজনৈতিক সমর্থন আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও শক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর পরে ছাত্রদলসহ বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা কর্মীরাও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়।

কোটা বাতিলের ৪ দফা দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ও রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের সাথে ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতাকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিয়ে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রেললাইন অবরোধ করেন। এই 'বাংলা ব্লকেড' কর্মসূচির প্রভাবে তখন পুরো রাজশাহী শহরে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এদিকে ২০২৪ সালের ৭ জুলাই শুরু হওয়া এই ব্লকেড কর্মসূচির কারণে দেশের সাধারণ জনজীবন ও পরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ধর্মঘটও পালিত হয়। সড়কের নিয়ন্ত্রণ ছিল শিক্ষার্থীদের হাতে। স্বভাবতই ওইদিন শিক্ষার্থীদের উপর্যুপরি উপস্থিতি ও দৃঢ়তায় যান চলাচল রীতিমতো বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ, মিছিল, পদযাত্রা ও মানববন্ধন করেন।

ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের তৎপরতা
আন্দোলনের আগে থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দেশী ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি উপস্থিতি ছিল। সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে থাকলেও হাজারো শিক্ষার্থীর শান্তিপূর্ণ কিন্তু দৃঢ় অবস্থানের কারণে প্রশাসন চাপে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নেয়। তবে সেদিন রাজশাহীতে আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং অবরোধ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন। এদিন রাজপথে মুখর ছিল আন্দোলন আর  স্লোগানে। দিনভর রাজশাহীর রাজপথে উচ্চারিত হতে থাকে—
"কোটা না মেধা—মেধা, মেধা"= "দফা এক, দাবি এক—কোটা নট কাম ব্যাক"== "তারুণ্যের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার"। এসব স্লোগান দ্রুতই সারাদেশের আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

রাজশাহীর রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি টার্নিং পয়েন্ট
বিশ্লেষকদের মতে, ১০ জুলাইয়ের পর রাজশাহীর আন্দোলন আর কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, নাগরিক সমাজ এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সংযোগ ক্রমশ বাড়তে থাকে। পরবর্তী কয়েক দিনে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। কোটা সংস্কারের দাবির পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনা, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নও সামনে চলে আসে। শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ের আন্দোলন আগস্টের শুরুতে বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
রাজশাহীর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৪ সালের ১০ জুলাইয়ের ‘বাংলা ব্লকেড’ ছিল রাজশাহীতে ছাত্র আন্দোলনের একটি মোড় ঘোরানো দিন। এই দিন শিক্ষার্থীদের দৃঢ় অবস্থান, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির প্রকাশ্য সমর্থন এবং সাধারণ মানুষের সহানুভূতি আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। পরবর্তী সময়ে যে গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে, তার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই দিনের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই।

আজ, ১০ জুলাই ফিরে এলে রাজশাহীর মানুষ স্মরণ করেন সেই দিনটিকে—যেদিন হাজারো শিক্ষার্থীর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের দাবি, আর সেই দাবিই পরবর্তীকালে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের আন্দোলনের সঙ্গে একীভূত হয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।  

প্রকাশক ও সম্পাদক : মহিব্বুল আরেফিন
যোগাযোগ: ২৬৮, পূবালী মার্কেট, শিরোইল, ঘোড়ামারা, রাজশাহী-৬০০০
মোবাইল: ০৯৬৩৮ ১৭ ৩৩ ৮১; ০১৭২৮ ২২ ৩৩ ২৮
ইমেইল: [email protected]; [email protected]