07/12/2026 রাজশাহীতে আস্থা ফিরেছে ইসলামী ব্যাংকে ॥ বাড়ছে গ্রাহকের ভিড়
শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন
১২ জুলাই ২০২৬ ১৭:৫৮
"কল্যাণমুখী ব্যাংকিংয়ের অগ্রযাত্রায় গড়ি আগামীর বাংলাদেশ" এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে দেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম পথিকৃৎ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে আবারও গ্রাহকদের আস্থা ফিরে পাচ্ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার উদ্যোগ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে রাজশাহীর বিভিন্ন শাখায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে আমানতকারীদের উপস্থিতি। নতুন গ্রাহকের পাশাপাশি পুরোনো গ্রাহকরাও পুনরায় ফিক্সড ডিপোজিট, বিভিন্ন মেয়াদি আমানত এবং সঞ্চয়ভিত্তিক স্কিমে অর্থ জমা রাখছেন।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি ব্যাংকের মূল ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা। সেই আস্থা যখন ফিরে আসে, তখন আমানত প্রবাহ বাড়ে, বিনিয়োগ সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক আমানত বৃদ্ধিকে তারা সেই ইতিবাচক পরিবর্তনেরই প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির আলোচনা-সমালোচনার পর এখন নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক বছরে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বিভিন্ন মহলে মালিকানা, পরিচালনা, করর্পোরেট সুশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে ব্যাংকটিতে এস আলম গ্রুপের প্রভাব ও লুটেরা সাবেক এমডিকে আবারও নিয়োগ দিলে গ্রাহকের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ দেখা দেয়। এনিয়ে গত মাস থেকে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক ফোরামের উদ্যোগে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের অপসারণ ও এস আলম গ্রুপের প্রভাব মুক্তির দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
এসব মানববন্ধন কর্মসূচিতে ব্যাংকের গ্রাহক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এসময় অভিযোগ করা হয়, ইসলামী ব্যাংকে গ্রাহকদের আস্থা ও স্বার্থকে উপেক্ষা করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এমন কি রাতারাতি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন করে এমন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেয়া হয়, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে নিজেদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তারা বিতর্কিত চেয়ারম্যানকে অপসারণ করে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেয়ার দাবি জানান। এসময় সাধারণ গ্রহদের পাশাপাশি বড় বড় অনেক গ্রাহক আমানত তুলে নেন। এক পর্যায়ে ব্যাংকটি গ্রহকদের চাহিদাকৃত অর্থ দিতে পারতনা।
এমন কি বুথে ১০ হাজার টাকার বেশীও তোলার যেতনা। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তনসহ ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার, পরিচালনা কাঠামোয় পরিবর্তন এবং গ্রাহকসেবার উন্নয়নের উদ্যোগের ফলে ইসলামী ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
রাজশাহীতে বাড়ছে আমানত : রাজশাহীতে ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিনই নতুন হিসাব খোলা, মেয়াদি আমানত এবং সঞ্চয় স্কিমে অংশগ্রহণের জন্য গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়ছে। অনেক পুরোনো গ্রাহকও তাদের আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধি করছেন।
ব্যাংকের গ্রাহক এবং রাজশাহীর বিশিষ্ট চিকিৎসক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, "ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মানুষের আস্থা, সততা ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের একটি সফল প্রতীক। অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপের কারণে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম, সুশাসন এবং গ্রাহকদের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছিল। কিন্তু খুরশিদ আলমকে অপসারণ করে ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব অভিজ্ঞ নির্বাহী কর্মকর্তার হাতে দায়িত্ব অর্পণের পর পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
গ্রাহকদের হারানো আস্থা দ্রুত ফিরে আসছে, আমানত প্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ব্যাংকটি এখন অনেক বেশি স্থিতিশীল ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।" তিনি আরও বলেন, "ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে পরিচালনা করা হলে ইসলামী ব্যাংক আবারও দেশের ব্যাংকিং খাতের নেতৃত্বে ফিরে আসবে। জনগণের প্রতিষ্ঠানকে জনগণের স্বার্থেই পরিচালিত হতে দিতে হবে। কোনো অবৈধ, অযৌক্তিক বা অনৈতিক সরকারি হস্তক্ষেপ ব্যাংকিং খাতের জন্য কখনোই কল্যাণকর নয়।" তিনি "বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, সুশাসন এবং জনগণের আস্থা নিশ্চিত করণের পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংক অতীতেও দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, ভবিষ্যতেও সেই ভূমিকা আরও শক্তিশালীভাবে পালন করতে সক্ষম হবে। যদি ব্যাংকটিকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়।" অন্য গ্রাহক বলেন, "আগে কিছুটা দ্বিধা ছিল। কিন্তু এখন ব্যাংকের সেবার মান, কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা এবং কার্যক্রমের স্বচ্ছতা দেখে আবারও ইসলামী ব্যাংকে আমানত রেখেছি। ভবিষ্যতেও এই ব্যাংকের সঙ্গেই থাকতে চাই।" আশিকুর রহমান নামের এক গ্রাহক বলেন, "এক সময় ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন ছিল। কিন্তু বর্তমানে দক্ষ নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা, সততা, জবাবদিহিতা এবং গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নের মাধ্যমে ব্যাংকটি আবারও মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এখন মানুষ নিশ্চিন্তে তাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ ইসলামী ব্যাংকের হাতে তুলে দিচ্ছেন।"
ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা নির্ভর করে চারটি বিষয়ের ওপর। তা হলো স্বচ্ছতা, সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং উন্নত গ্রাহকসেবা। এই চার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলে গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবেই সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ফিরে পান। তাদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, দ্রুত লেনদেন, শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থা এবং গ্রাহকবান্ধব কার্যক্রম আমানত বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এতে করে অর্থনীতিতেও পড়েছে ইতিবাচক প্রভাব। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকে আমানত বাড়লে তারল্য সংকট কমে, শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসে। বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি দেশের বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
ইসলামী ব্যাংক এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং রাজশাহী শাখা প্রধান মোহা: খালেকুজ্জামান বলেন, "একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো গ্রাহকের আস্থা। সেই আস্থা অর্জন ও ধরে রাখাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, শরিয়াহ পরিপালন এবং সর্বোচ্চ গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করছি। নিরাপদ, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে গ্রাহকদের প্রত্যাশা পূরণে আমরা বদ্ধপরিকর।" তিনি আরও বলেন, গ্রাহকদের আস্থা ও আমানত বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকলে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও বলেন, কিছু যুক্তিযুক্তি কারণে আমাদের গ্রাহকরা কোন কোন ক্ষেত্রে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়লেও সার্বিকভাবে তারা ইসলামি ব্যাংক এর উপর বিশ্বাসকে অটুট রেখেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামি ব্যাংক এর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার জায়গাতে চিড় ধরলেও পরে তারা আবারও ইসলামি ব্যাংকে ফিরে এসেছেন। আমাদের গ্রাহকরা ইসলামি ব্যাংককে তাদের আস্থা-ভরশার জায়গাই মনে করেন। তাদের কারণে বিশ^ব্যাপী ইসলামী ব্যাংক নিজস্ব স্থান তৈরি করে নিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আস্থা পুনরুদ্ধারের এই ধারা ধরে রাখতে হলে সুশাসন, দক্ষ নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা, নিয়মিত তদারকি এবং গ্রাহকসেবার মান আরও উন্নত করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে সংস্কার কার্যক্রম সফল হলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি আবারও দেশের অন্যতম শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য শরিয়াহ ভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থান আরও সুসংহত করতে পারবে এমনটাই প্রত্যাশা গ্রাহকসহ ব্যাংকিং সংশ্লিষ্টদের।