টমেটোর ভালো ফলনে কৃষিতে স্বস্তি
ঝুঁকিতে রাজশাহী অঞ্চলের দেড়শ কোটি টাকার বাণিজ্য
শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন | প্রকাশিত: ৭ জানুয়ারী ২০২৬ ১৭:৫৬; আপডেট: ৭ জানুয়ারী ২০২৬ ১৭:৫৭
চলতি মৌসুমে রাজশাহী ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে টমেটোর ভালো ফলনে স্বস্তি রয়েছেন কৃষকরা। গত বছরের তুলনায় উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি মৌসুমের শুরুতে দাম ভালো থাকায় লাভের মুখ দেখেছেন চাষিরা। সংশ্লিষ্টরা রাজশাহী অঞ্চলে এবার দেড়শ কোটি টাকার টমেটো বাণিজ্য হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন। এই খাতে সরাসরি জড়িত রয়েছেন প্রায় ৮ হাজার কৃষক এবং চাষ থেকে বিপনন পর্যন্ত টমেটো বেচাকেনায় অস্থায়ীভাবে প্রায় ৯ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তবে কিছু মুনাফালোভী কৃষক ও ব্যবসায়ী অধিক লাভের জন্য অপরিপক্ব টমেটোকে বিষাক্ত কেমিক্যাল স্প্রে করে লাল রং এনে বিক্রি করছে। এনিয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে এ অঞ্চলের দেড়শ কোটি টাকার টমেটো বাণিজ্য।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার অন্যান্য উপজেলার তুলনায় গোদাগাড়ী উপজেলায় টমেটোর চাষ সবচেয়ে বেশি। রাজশাহীর চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখানকার টমেটো সরবরাহ হয়। ব্যাপক উৎপাদনের কারণে গোদাগাড়ীকে অনেকেই ‘টমেটোর রাজ্য’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।
এবার জেলায় মোট ৩ হাজার ১৪৬ হেক্টর জমিতে টমেটোর চাষ হয়েছে। উৎপাদনের গড় হার প্রায় ৯৫ হাজার থেকে ১ লাখ মেট্রিক টনের মধ্যে হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বর্তমান বাজার দর ১৫ টাকা হিসেবে জেলায় আনুমানিক দেড়শ কোটি টাকার টমেটো বাণিজ্য হবার আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অধিকাংশ টমেটো মাঠ থেকেই পাইকারদের কাছে বিক্রি হয়ে যায়। উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় কৃষকরা টমেটো চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। সাধারণত আউশ ধান কাটার পর গোদাগাড়ীতে টমেটোর আবাদ শুরু হয়।
বর্তমানে এখানে ১৭ থেকে ২০ জাতের টমেটোর চাষ হচ্ছে, যার বেশিরভাগই হাইব্রিড। গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষকরা জানান, মাঠের অন্য ফসলের তুলনায় টমেটো চাষ খুবই লাভজনক। ফলে বর্তমানে পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে কৃষকরা দিন দিন টমেটো চাষে ঝুঁকছে। এতে প্রতি বছর চরাঞ্চলে বাড়ছে টমেটো চাষ। পাশাপাশি চরাঞ্চলের জমি পলিমাটি হওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলের চাইতে টমেটোর সাইজ বড় এবং দাম বেশি পাচ্ছে চাষিরা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যানায়, গোদাগাড়ীতে দেশের মোট শীতের টমেটো উৎপাদনের তিন ভাগের দুই ভাগ উৎপাদিত হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গোদাগাড়ীতে টমেটোর আবাদ হয়েছিল ২ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এখানে ২ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে ৫২ হাজার ৭০০ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ হাজার ১৫ হেক্টর জমিতে ৯০ হাজার ৪৫০ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে ৮৯ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন টমেটো উৎপাদিত হয়েছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে টমেটো আবাদ করা হয়েছে। জেলায় মোট ৩ হাজার ১৪৬ হেক্টর জমিতে টমেটোর চাষ হয়েছে।
মোট উৎপাদন আশাকরা হচ্ছে প্রায় ৯৫ হাজার থেকে ১ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধু গোদাগাড়ী উপজেলাতেই আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, গোদাগাড়ীতে চলতি মৌসুমে টমেটো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৪ হাজার ৭৬০ টন। গড়ে প্রতি কেজি টমেটো ১৫ টাকা দরে বিক্রি হলে এ উপজেলায় মোট আয় দাঁড়াবে প্রায় ১১২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এই খাতে সরাসরি জড়িত রয়েছেন প্রায় ৮ হাজার কৃষক এবং টমেটো বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে অস্থায়ীভাবে ৮ থেকে ৯ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
ঝুঁকিতে দেড়শ কোটি টাকার বাণিজ্য
গোদাগাড়ীতে টমেটোর ভরা মৌসুম চলবে আরও অন্তত মাস দেড়েক। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে অস্থায়ী বাড়ি ভাড়া নিয়ে আস্তানা গেঁড়েছেন। কিন্তু কিছু মুনাফালোভী কৃষক ও ব্যবসায়ীরা অধিক লাভের জন্য অপরিপক্ব টমেটোকে কৃত্রিম উপায়ে পাকাচ্ছে। তারা টমেটোয় বিষাক্ত কেমিক্যাল স্প্রে করে লাল রং এনে বিক্রি করছে। উপজেলার বিভিন্ন মাঠে প্রকাশ্যেই এই অনিরাপদ কাজ চলছে। এসব টমেটো স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে দেশের নানা প্রান্তে যাচ্ছে।
গোদাগাড়ী উপজেলার হেলিপ্যাড এলাকায় এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি প্রায় ৬০০ মণ কাঁচা টমেটো কিনে স্প্রে করছেন। এসব টমেটো পাকলে ঢাকায় পাঠানো হবে। তিনি আরও জানান, ১০০ টাকা মূল্যের দুটি কীটনাশক ২০ বস্তায় ব্যবহার করা হয়। এতে প্রায় ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত মুনাফা হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, মাঠ থেকে ৪টি (৪৫ কেজি) হিসেবে ৭০০-৮০০ টাকা দরে কাঁচা টমেটো কেনা হচ্ছে। এরপর তাতে ‘ইথিফন’ ও ‘ডায়াথিন এম’ জাতীয় ওষুধ স্প্রে করে প্রায় ১০ দিন রোদে শুকিয়ে লাল করা হয়। সম্পূর্ণ লাল রঙ ধারণ করলেই এগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বড় বড় আড়তগুলোতে ট্রাকযোগে পাঠানো হয়।
গোদাগাড়ী উপজেলার পিরিজপুর গ্রামের টমেটো চাষি আকবর আলী বলেন, “আমরা নিয়মিত টমেটো চাষ করি। কোনো বছর লাভ হয়, আবার কোনো বছর ক্ষতিও হয়। তবে চলতি মৌসুমে ফলন ভালো হয়েছে। আশা করছি ভালো লাভ হবে।” একই গ্রামের আরেক চাষি সামাদ আলী বলেন, “আমি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছি। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা লাভ হয়েছে। রাজশাহীর টমেটো ব্যবসায়ী মুক্তার হোসেন জানান, “এবার টমেটোর উৎপাদন ভালো হয়েছে। প্রতিদিন এক ট্রাক করে টমেটো ঢাকায় পাঠাচ্ছি। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লায় যাচ্ছে। তবে দাম ওঠানামা করায় লাভের পাশাপাশি লোকসানও হয়েছে। সব মিলিয়ে তেমন বেশি লাভ হয়নি।”
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সচেতন নাগরিকরা অতি মুনাফা লাভের আশায় অনৈতিক কাজ থেকে কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের বিরত থাকার আহ্বন জানান। নতুবা যে কোন মুহুর্তে এঅঞ্চলের সম্ভাবনাময় একটি বাণিজ্যের অকাল মৃত্যু ঘটবে বলে আশংকা প্রকাশ করেন।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: