ক্রমে বাড়ছে ঋণের বোঝা

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৬:১৭; আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৬:১৭

ছবি: সংগৃহিত

ধীরে ধীরে বাড়ছে ঋণের বোঝা সরকারের উপর। পাশাপাশি বাড়ছে সুদসহ ঋণ পরিশোধের চাপও। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকারকে বিদেশী ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছিল ১১২ কোটি ডলার। পাঁচ বছর পর বিদেশী ঋণ পরিশোধের এ চাপ দ্বিগুণ হয়েছে। খবর বণিক বার্তার।

চলতি অর্থবছরে ঋণ পরিশোধে সরকারকে সুদসহ ২৭৭ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। আর দুই অর্থবছর পর এর পরিমাণ ৪০২ কোটি বা ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে।

বিদেশী ঋণ পরিশোধের এ চিত্র উঠে এসেছে সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক প্রতিবেদনে। এতে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় কীভাবে সরকারের বিদেশী ঋণ পরিশোধ করা হবে, তা তুলে ধরা হয়েছে। তবে বেসরকারি খাতের বিদেশী ঋণ পরিশোধের বিষয়টি এ পরিসংখ্যানে দেখানো হয়নি। একই সঙ্গে এ হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে সরকারি কোম্পানিগুলোর নেয়া বিদেশী ঋণের বিষয়টিও।

ইআরডি আয়োজিত ‘সুশাসন নিশ্চিতকরণে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক সেমিনারে গতকাল দুটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। ‘ফরেন অ্যাসিস্ট্যান্স ম্যানেজমেন্ট; প্রেজেন্ট সিনারিও’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে দেশের সরকারি খাতে বিদেশী ঋণের স্থিতি ৫৬ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ৬৬৬ কোটি ডলার। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক ঋণ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন ভিন্ন তথ্যই দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের মোট বিদেশী ঋণের স্থিতি ছিল ৯৩ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৬৮ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারই ছিল সরকারি খাতের ঋণ। সরাসরি সরকারের নেয়া বিদেশী ঋণ ছিল ৫৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার, যার পুরোটাই দীর্ঘমেয়াদি। বাকি ১১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার বিদেশী ঋণ নিয়েছে সরকারি কোম্পানিগুলো। মার্চ শেষে দেশের বেসরকারি খাতের নেয়া বিদেশী ঋণের স্থিতি ২৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইআরডি থেকে বিদেশী ঋণ পরিশোধের যে পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে, সেটি শুধু সরকারি ঋণকে আমলে নিয়ে করা হয়েছে। এ কারণে ২০২৪-২৫ সালে বিদেশী ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দেখাচ্ছে ৪ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু বিদেশী উৎস থেকে নেয়া সরকারি ঋণের পাশাপাশি এ সময়ে সরকারি কোম্পানি ও বেসরকারি খাতের নেয়া ঋণও সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। সব মিলিয়ে আগামী অর্থবছর থেকে বিদেশী ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ১০-১২ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।

অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বণিক বার্তাকে বলেন, রাজস্ব দিয়ে সরকারের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা পর্যালোচনা করলে সরকারের বিদেশী ঋণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণকে আমলে নিতে হবে। যদি ব্যালান্স অব পেমেন্টের দিক থেকে পর্যালোচনা করা হয়, তাহলে সরকারি-বেসরকারি সব খাতের বিদেশী ঋণ পরিশোধের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। কারণ বেসরকারি যেসব কোম্পানি বিদেশী ঋণ নিয়েছে, সেটি পরিশোধের দায়বদ্ধতাও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সরকারের। এক বছর পর সরকারের নেয়া বিদেশী ঋণ ৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হলে এর সঙ্গে বেসরকারি খাতের ঋণও যুক্ত হবে। বেসরকারি খাতের ঋণের বেশির ভাগেরই ধরন স্বল্পমেয়াদি। এ কারণে আগামীতে প্রতি বছর ১০-১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ দেশের ঘাড়ে পড়বে।

ইআরডির প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বিদেশী ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি ছিল ১৬৯ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বিদেশী ঋণ ছাড় দেয়া হয়েছে। প্রতিশ্রুতির পরও ছাড় হয়নি এমন বিদেশী ঋণের পরিমাণ ৪৮ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সরকারি বিদেশী ঋণের স্থিতি ৫৬ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার। এ ঋণের ৪০ শতাংশ দ্বিপক্ষীয়। বাকি ৬০ শতাংশ ঋণ এসেছে বহুপক্ষীয় বিভিন্ন সংস্থা থেকে।

ইআরডি বলছে, সরকারের নেয়া বিদেশী ঋণের গড় সুদহার ১ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ঋণের গড় গ্রেস পিরিয়ড ৭ বছর ৬ মাস। গড়ে আগামী ২৩ বছর ২ মাসের মধ্যে সব বিদেশী ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশী ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে সরকার। একই সময়ে ১০ বিলিয়ন ডলার বিদেশী ঋণ ও অনুদান ছাড় হয়েছে।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলে আমরা ঋণের অংশীদার ছিলাম। স্বাধীনতার পর ঋণ নেয়া হচ্ছে দেশের উন্নয়নে। বিদেশী ঋণ নিয়ে কোনো ভয় নেই। যেকোনো দেশের অর্থনীতির জন্য ঋণ নিতে হয়। তবে তা জেনে-বুঝে-শুনে নিতে হবে। অনেকে ভয় দেখায়, যা ঠিক নয়। এসব ঋণ হিসাব করে নিতে হবে, যেন অর্থনীতিতে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কাজে লাগে।

ইআরডির প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্যই ৫৬ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারের বিদেশী ঋণ নিতে হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার বিশ্বব্যাংক। বহুজাতিক সংস্থাটি বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৩৩ শতাংশ একাই জোগান দিয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৩ দশমিক ৫২ শতাংশ ঋণের জোগান এসেছে এডিবি থেকে। এছাড়া জাপান ১৭ দশমিক ৭৯, চীন ৮ দশমিক ৪১, রাশিয়া ৮ দশমিক ৯৩ ও ভারত ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ বিদেশী ঋণের জোগান দিয়েছে।

বক্তব্যে বৈদেশিক ঋণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, বৈদেশিক ঋণে সুদ কম, পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধ করতে হয়। বৈদেশিক ঋণে সুদ শূন্য দশমিক ৭৫ থেকে দেড় শতাংশ। এ ঋণ পরিশোধ করার সময়টাও অনেক বড়। অনেক ঋণ আবার ৩১ বছরে পরিশোধ করতে হয়। আর দেশীয় ঋণ যদি ব্যাংক থেকে নেয়া হয় তাহলে সাড়ে ৭ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দেয়া লাগে। বিদেশে যদি কম সুদ পাই তাহলে নেয়া উচিত। এখনো ৪৮ বিলিয়ন ডলার পাইপলাইনে আছে। তার মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার ২০২২ সালে পেয়েছি। যেহেতু সস্তায় ও দীর্ঘমেয়াদে বিদেশী ঋণ পাওয়া যাচ্ছে, এজন্য এ ঋণই নিতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, আজকে বিদেশী ঋণের ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা উঠেছে। আজকে যে বঙ্গবন্ধু সেতু, সেটা কিন্তু বিদেশী ঋণে হয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কৃষির উন্নয়নে কাজ করছে। এটা সম্ভব হয়েছিল বৈদেশিক ঋণ সহায়তায়। বিআইসিসি, মেট্রোরেল, ন্যাশনাল হাইওয়েসহ অনেক কিছু হচ্ছে বিদেশী ঋণে। বিদেশী সহায়তা আমাদের উন্নয়নে বড় ভূমিকা পালন করছে। উন্নত দেশে রূপান্তর না হওয়া পর্যন্ত আমাদের প্রচুর বিদেশী ঋণ নিতে হবে।

বিদেশী ঋণের সঠিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশী ঋণের মাধ্যমে অনেক সমালোচনা হয়। শ্রীলংকা কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে উন্নত দেশ ছিল, মাথাপিছু আয় ও শিক্ষার হার ভালো ছিল। বেশকিছু ভুলের কারণে তাদের এ অবস্থা। দক্ষিণ কোরিয়াও ঋণ নিয়ে অনেক এগিয়ে গিয়েছে। তবে কিছু দেশ প্রচুর বিদেশী ঋণ নিয়েও কিছু করতে পারেনি, যেমন পাকিস্তান। এর অন্যতম কারণ ঋণ ব্যবস্থাপনার অভাব। কতগুলো ভুল করে তারা সমস্যায় পড়েছে। তাই আমাদের বিদেশী ঋণের বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে।

সেমিনারে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ঋণ চুক্তি করার সময় ইআরডি আইন মানে না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তা গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়ায়। দেশের উন্নয়ন করতে চরিত্র ঠিক করতে হবে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মানুষ হারাম খেলে, চুরি করলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। মানুষের চরিত্র ঠিক করতে হবে। চরিত্র ঠিক না করলে কোনো কাজ হবে না।

বিদেশী ঋণ সহায়তা নিয়ে বাস্তবায়ন করা প্রকল্পগুলো অনুমোদনের সময় পরিকল্পনা কমিশন আটটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে বলে উল্লেখ করা হয় সেমিনারের এক উপস্থাপনায়। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে দুর্বলভাবে প্রকল্প প্রণয়ন, দাতানির্ভরতা, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার অনুপস্থিতি, অপ্রয়োজনীয় ও অতিপ্রাক্কলিত ব্যয়, দাতা সংস্থার কাছ থেকে দ্রুত অনুমোদন করতে গিয়ে প্রকল্পের তথ্যাদি ভালোমতো যাচাই না করা, ঋণের কঠিন শর্ত, বিদেশী পরামর্শকদের ওপর অতিনির্ভরতা ও ভূমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা।

পরিকল্পনা কমিশনে বিদেশী সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব হওয়ার জন্য এতে চারটি কারণের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) জমা দিতে বিলম্ব হওয়া, ইআরডির সঙ্গে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সমন্বয় না থাকা, ঋণের আলাপ-আলোচনা ও ঋণ চুক্তি করতে বিলম্ব হওয়া এবং সক্ষমতার ঘাটতির কারণে প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব হয় বলে সেমিনারে জানানো হয়।

সেমিনারে ইআরডি সচিব শরিফা খান, পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশীদ, আইএমইডি সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানসহ পরিকল্পনা কমিশনের অন্যান্য সদস্য ও কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

নিউজের লিঙ্ক



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top