বিদ্যুৎ সংকট: ২৫-৫০ শতাংশ কমেছে শিল্প উৎপাদন

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৬:৩৫; আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৬:৩৮

ছবি: সংগৃহিত

একদিকে জ্বালানি ও কাঁচামালের চড়া দাম, অন্যদিকে ডলার সংকট। ফলে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনও। তারই প্রভাবে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছে প্রধান প্রধান ভারী শিল্পগুলি। খবর টিবিএসের। 

বৈশ্বিক এ সংকট মোকাবিলায় নিয়মিত লোডশেডিং করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি আমদানি খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এতে করে সার, সিমেন্ট, সিরামিক, টেক্সটাইল এবং ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য প্রস্তুতকারকদের উৎপাদন কমেছে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। নিত্য লোডশেডিংয়ের ফলে তাদের উৎপাদন খরচও বেড়েছে ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত।

বিদ্যুতের এই সংকটে বিশ্ববাজারে দেশজ শিল্পগুলির প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা হুমকির মুখে। এই অবস্থায় শিল্প সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, তারা বিদেশি ক্রেতাদের কার্যাদেশ হারাবেন। উৎপাদন সক্ষমতা অনুসারে, প্রস্তুতকারক খাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ বরাদ্দ দিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।

শিল্প মালিক এবং পরিচালন কর্মকর্তারা জানান, রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়েছে, প্রস্তুতকারক খাতই যার বড় আমদানিকারক। একইসঙ্গে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সেই কাঁচামাল ব্যবহারে 'সিস্টেম লস' (অপচয়) বেড়েছে, যা উৎপাদনকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।

দেশে সিরামিক খাতের শীর্ষ কোম্পানি আরএকে সিরামিকস- এর কারখানায় দৈনিক ৯ লাখ বর্গমিটার টাইলস উৎপাদন হয়। কিন্তু, গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কটের কারণে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ৪.৫ লাখ বর্গমিটারে নেমেছে। তবে উৎপাদন কমলেও প্রতিষ্ঠানটির এখাতে ব্যয় বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি।

আরএকে সিরামিকসের প্রধান পরিচালন ও আর্থিক কর্মকর্তা সাধন কুমার দে টিবিএসকে বলেন, 'আমাদের কারখানায় দিনে ১২ ঘন্টাই গ্যাস থাকে না। তার সাথে লোডশেডিং চলছে। এতে প্রোডাকশন ৪০ শতাংশ কমলেও, খরচ ঠিকই শতভাগের জন্য হচ্ছে। অর্থাৎ বাকি ৬০ শতাংশ উৎপাদনে একই খরচ হচ্ছে'। উৎপাদন খরচ বাড়লেও মূল্যস্ফীতির বাজারে পাইকারি পর্যায়ে দাম সমন্বয় করা যায়নি, এতে আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, 'আমাদের প্রতিষ্ঠানের কোনো ব্যাংক ঋণ না থাকায় আমরা টিকে থাকতে পারছি। কিন্তু যাদের বড় ঋণ রয়েছে তারা বিপদে আছে'।

বাংলাদেশের ইস্পাত প্রস্তুতকারকদের সমিতি– বিএসএমএ- এর মহাসচিব মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ইস্পাত কারখানায় ২ ঘন্টা বিদ্যুৎ না থাকার প্রভাব ৬ ঘন্টার সমান হয়। কারণ, মেশিন পুনরায় চালু হতেও ৬ ঘন্টা সময় নেয়। 'এই কারণে কারখানার মেশিনগুলো ২৪ ঘন্টাই সচল রাখতে হয়'।

তিনি জানান, সরকারের কৃচ্ছতা অবলম্বনের অংশ হিসেবে দৈনিক লোডশেডিং শুরু করার পর থেকে ইস্পাত খাতের কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমেছে। এই ব্যাঘাতের ফলে উৎপাদন খরচও অনেক বেড়েছে।

শহীদুল্লাহ মেট্রোসিম ইস্পাত ও মেট্রোসিম সিমেন্টেরও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশের সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির সহ-সভাপতি। তিনি বলেন, সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতেও একইভাবে উৎপাদন কমেছে। কারণ, গ্যাসের চাপ কম থাকায় ক্যাপটিভ পাওয়ার-ও ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকায় এই বর্ধিত খরচ বিক্রির সময় সমন্বয় করা যাচ্ছে না। তবে সরকার অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে রড এবং সিমেন্টের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। সেখানে আমরা আমাদের সমস্যা এবং চাওয়া জানিয়েছি'। চলমান সংকটের সময়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি যেন টিকে থাকতে পারে সেজন্য তাদের ক্ষেত্রে ভ্যাট, কর ও অগ্রিম আয়কর কিছুটা সহনীয় করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে চড়া দাম এবং ডলার সঙ্কটের কারণে সরকার এখন খোলাবাজার থেকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি বন্ধ রেখেছে। এতে গ্যাসের সরবরাহ ৭ থেকে ৮ শতাংশ কমেছে। আর জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানোয়, সারাদেশে লোডশেডিং বেড়েছে।

জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে গ্যাসের দৈনিক সরবরাহ রয়েছে ২,৭৯৭ এমএমসিএফ, যা সংকটের আগে গত জুনে ছিল ৩,১০০ এমএমসিএফ। মোট সরবরাহের মধ্যে শিল্প খাতে গ্যাস ব্যবহার হয় ১৫.৭৬ শতাংশ বা ৪৪০.৮০ এমএমসিএফ। সার উৎপাদনে ব্যবহার হয় ৫.৫০ শতাংশ বা ১৫৩ এমএমসিএফ। আর ৪২.৯৯ শতাংশ গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিকে শিল্প খাতে প্রতিদিন বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় মোট সরবরাহের ২৮ শতাংশ। বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন প্রতিদিন ৯,৬০০– ১১,৭০০ মেগাওয়াট। যা সংকটের আগে ছিল ১১,১০৫– ১২,৯৫১ মেগাওয়াট।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের মোট রপ্তানির ৫৬ শতাংশই প্রস্তুতকারক খাত থেকে হচ্ছে। আর এই খাতের উপর ভর করেই সরকার প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করছে। কিন্তু, চলমান সঙ্কটের ফলে বিদেশি ক্রেতাদের সময় মতো পণ্য ডেলিভারি না দিতে পারলে– অর্ডার অন্য দেশে চলে যাবে। আর অর্ডার একবার চলে গেলে সেটা ফেরত আনা অনেক কঠিন কাজ। তাই সরকারের উচিত উৎপাদন ক্ষমতা বিচার করে এ খাতে গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা।

ভার্টিক্যাল রোলার মিল (ভিআরএম) প্রযুক্তি ব্যবহার করে সিমেন্ট উৎপাদন করছে দেশের বসুন্ধরা, মেঘনা, প্রিমিয়ার, আবুল খায়ের এবং ক্রাউন সিমেন্ট এর মত বড় বড় শিল্পগ্রুপগুলো। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম খরচে সিমেন্ট উৎপাদন করা গেলেও এখানে জ্বালানি হিসেবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস দুটোই প্রয়োজন। আর এটিই এখন সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। ফলে তাদের উৎপাদন এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

ইলেকট্রনিক্স পণ্যের স্থানীয় প্রস্তুতকারক শিল্প প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন গ্রুপ। বারবার লোডশেডিং এর কারণে প্রতিষ্ঠানটির গাজীপুরে তাদের টিভি ও ফ্রিজ তৈরির কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে।

নারায়ণগঞ্চের ফতুল্লা ডাইংয়ে প্রতিদিন তিন শিফটে ৮০০ শ্রমিক কাজ করে। গত দুমাস ধরে গ্যাসের চাপ না থাকায়– এখন এক শিফট চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

ফতুল্লা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামিম এহসান টিবিএসকে বলেন, 'কারখানার প্রোডাকশন ক্যাপাসিটির ৯০ শতাংশের কম ব্যবহার হলে ব্রেকইভেন কস্ট- (আয় ও খরচের সীমা) এর নিচে চলে আসে। এখন প্রতি মাসেই আমাদের ব্যাংকের দায় বাড়ছে।'

তিনি আরও বলেন, 'গ্যাসের সরবরাহের অভাবে আমাদের ৪টি ইউরিয়া উৎপাদনকারী কারখানার মধ্যে তিনটি বন্ধ করতে হয়েছে। এরমধ্যে দুটি পরে চালু করা গেলেও, এখনও যমুনা সার কারখানা বন্ধ রয়েছে। কারখানা বন্ধ থাকার কারণে জামালপুরে ইউরিয়ার সরবরাহ নিয়েও সংকট তৈরি হয়েছে'।

নিউজের লিঙ্ক



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top