চা উৎপাদন কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ২ অক্টোবর ২০২২ ০৯:৫৫; আপডেট: ৯ ডিসেম্বর ২০২২ ০৮:৩২

ফাইল ছবি

শ্রমিক অসন্তোষ, কম বৃষ্টিপাত সহ নানা কারনে কমেছে চা পাতা উৎপাদন। আগের বছরের আগস্টের তুলনায় চা উৎপাদন কমেছে ৩৭ লাখ কেজি। এতে বাগানগুলোর ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকার মতো। খবর টিবিএসের।

বর্ষা মৌসুমেই বাগান থেকে চা উৎপাদন হয় সবচেয়ে বেশি। এ বছর বর্ষায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল তুলনামূলক কম। পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ভরা মৌসুমে ১৯ দিন চা উৎপাদন বন্ধ ছিল। এসবের প্রভাব পড়েছে মাসভিত্তিক চা উৎপাদনে।

চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ কোটি ৭৭ লাখ ৮০ হাজার কেজি। যদিও ওই বছর উৎপাদন হয়েছিল ৯ কোটি ৬৫ লাখ ৬ হাজার কেজি চা। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন অনেক বেশি হওয়ায় চলতি বছর লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে এক লাফে ১০ কোটি কেজিতে উন্নীত করা হয়। সে অনুযায়ী মাসভিত্তিক উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এগিয়ে ছিল দেশের বাগানগুলো। জুলাই পর্যন্ত আগের বছরের এক সময়ের তুলনায় ৫ লাখ ৬৯ হাজার কেজি বেশি উৎপাদন করেছিল দেশের ১৬৮টি বাগান। তবে আগস্টে বড় ধরনের ধস দেখা দেয় চা উৎপাদনে।

তথ্যমতে, ২০২১ সালের আগস্টে দেশে চা উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৪৩ লাখ ৮৭ হাজার কেজি। সর্বশেষ আগস্টে উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৭ লাখ ৬২ হাজার কেজি চা, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৩৬ লাখ ২৫ হাজার কেজি কম। এমনকি চা উৎপাদনের সবচেয়ে উত্কৃষ্ট সময় আগস্টে জুলাইয়ের চেয়েও ৫ লাখ ৫ হাজার কেজি চা উৎপাদন কম হয়েছে। এতে চলতি মৌসুমে প্রথমবারের মতো চা বোর্ডের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নাও হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে চা বোর্ডের কোনো কর্মকর্তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে চা খাত সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মো. ইউসুফ বণিক বার্তাকে বলেন, চা বাগানে বর্ষা মৌসুমেই সবচেয়ে বেশি চা উৎপাদন হয়। কিন্তু চলতি বছর ভরা মৌসুমেই শ্রমিক আন্দোলনের কারণে উৎপাদনে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছিল। যার প্রভাব এখন পড়তে শুরু করেছে। চা উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে নিলামে চায়ের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়ে গিয়েছে। তবে সম্প্রতি বর্ষা মৌসুম শেষেও বৃষ্টিপাত হওয়ায় ক্ষতি কিছুটা হলেও কমে আসতে পারে।

দেশে ১৬৮টি নিবন্ধিত চা বাগানের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়, নীলফামারীর সমতলের চা উৎপাদন ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানে চা উৎপাদন হয়। প্রতি বছর জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি চা উৎপাদন করে বাগানগুলো। এর মধ্যে আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরকে ধরা হয় চায়ের সবচেয়ে ভালো মৌসুম। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ার কারণে এ সময়ে বেশি ও ভালোমানের চা উৎপাদন হয়। কিন্তু এ বছর বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় এমনিতে চা উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছিল। এছাড়া শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে অন্তত দুই মাস ধরে চা বাগানগুলো ভালো মানের ও বেশি পরিমাণ চা উৎপাদনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বাগান মালিকরা।

চট্টগ্রামে চায়ের প্রধান আন্তর্জাতিক নিলাম কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ৯ আগস্ট থেকে শ্রমিক ধর্মঘট শুরু হলে এর প্রভাব শুরু হয় ১৬ আগস্ট ১৫তম নিলাম থেকে। ১৫তম নিলামে বিক্রির জন্য চা প্রস্তাব করা হয়েছিল ৩১ লাখ ৪২ হাজার ২০৩ কেজি। যদিও আগের বছরের একই নিলামে চা এসেছিল ৩৪ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪ কেজি। ২২ আগস্ট ১৬তম নিলামে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় চায়ের সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও ২৯ আগস্ট ১৭তম নিলাম থেকে ধর্মঘটের প্রভাব পুরোপুরি পড়তে শুরু করে। ১৭তম নিলামে বিক্রির জন্য চা প্রস্তাব করা হয় মাত্র ২৩ লাখ ১৯ হাজার ৮০১ কেজি, যা আগের বছরের একই নিলামের তুলনায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৩০৯ কেজি কম। এরপর ৫ সেপ্টেম্বর ১৮তম নিলামে চা পাঠানো হয়েছে ২৫ লাখ ৫৪ হাজার ৪৮১ কেজি, যদিও আগের বছরের একই নিলামে চা এসেছিল ৩০ লাখ ৬৮ হাজার ৬৭৪ কেজি। সর্বশেষ ১২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ১৯তম নিলামে বাগান মালিকরা চা পাঠিয়েছিল ২৪ লাখ ৪৩ হাজার ৩৫৪ কেজি, যা ২০২১ সালের ১৯তম নিলামের চেয়ে ৯ লাখ ১৬ হাজার ৬৮৫ কেজি কম। ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া ২০তম নিলামে ২৫ লাখ ৮০ হাজার ২৭৯ কেজি চা বিক্রির জন্য প্রস্তাব হয়। যদিও ২০২১ সালের ২০তম নিলামে চা বিক্রির জন্য পাঠানো হয়েছিল ৩২ লাখ ৫২ হাজার ১৮৫ কেজি। সর্বশেষ ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া ২১তম নিলামে ৩ লাখ ৩২ হাজার ১৯৭ কেজি কমে ৩০ লাখ ৩৩ হাজার ৩৭১ কেজি এবং আজ অনুষ্ঠেয় ২২তম নিলামে আগের বছরের একই নিলামের তুলনায় প্রায় ছয় লাখ কেজি কম চা অর্থাৎ ৩০ লাখ ৩৩ হাজার ৬২১ কেজি চা বিক্রির জন্য প্রস্তাব হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অক্টোবরজুড়ে চায়ের উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় কম হতে পারে। মূলত প্রায় এক মাসের প্লাকিং বন্ধ থাকায় বাগানগুলোর চা উৎপাদনের সামগ্রিক পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছে। অনেক বাগানে চা উৎপাদনের পরিবর্তে ডিসেম্বরের মতো পাতা কেটে ফেলতে হচ্ছে। আবার একই সময়ে বিভিন্ন প্লটে চা উৎপাদনের পাতা পূর্ণাঙ্গ হলেও পর্যাপ্ত শ্রমিকের অভাবে সামাল দিতে পারছে না বাগান কর্তৃপক্ষ। যার কারণে সুযোগ থাকলেও চা উৎপাদনের আগের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে বাগান কর্তৃপক্ষ।

দেশে চা উৎপাদন খাতে ৯ আগস্ট থেকে শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ১৯ দিন বন্ধ থাকার পর শ্রমিকদের মজুরি ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বাগান মালিকদের বৈঠকে শ্রমিকদের দৈনিক ন্যূনতম মজুরি ২৯ আগস্ট থেকে কাজে ফেরে দেশের দেড় লক্ষাধিক চা শ্রমিক। কিন্তু বাগানে চায়ের কুঁড়ি বড় হয়ে যাওয়ায় গুণগত মান হারিয়ে ফেলে বাগানগুলো। এ সংকট থেকে উত্তরণে আরো অন্তত এক মাস সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বাগান মালিক ও বাগানসংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপকরা।

চা বোর্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, চা উৎপাদন বাড়িয়ে দেশে চা শিল্পকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে চা বোর্ড। এ বছর চা উৎপাদন ১০ কোটি কেজি ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে বর্ষা মৌসুম শেষেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত হওয়ায় এখনো আশা ছাড়েনি চা বোর্ড। সবকিছু ঠিক থাকলে ১০ কোটি কেজি না হলেও লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পর্যন্ত চা উৎপাদন সম্ভব বলে মনে করছেন তিনি।

চট্টগ্রামের মেসার্স পাবনা টি হাউজের স্বত্বাধিকারী মো. আবদুর রহমান বলেন, বছরের মাঝামাঝিতে বাগান থেকে সবচেয়ে ভালোমানের চায়ের সরবরাহ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ধর্মঘটজনিত কারণে চায়ের সরবরাহ কমছে প্রতিটি নিলামে। যার কারণে নিলামে চায়ের দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে। আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে সরবরাহ আরো কমে গেলে চায়ের দাম বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মূল নিউজের লিঙ্ক



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top