সাক্ষ্য আইন সংশোধন বিল পাস: যা যা আছে সংশোধনে

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ৪ নভেম্বর ২০২২ ০৯:০০; আপডেট: ৯ ডিসেম্বর ২০২২ ০৮:০১

ফাইল ছবি

সংশোধন হলো বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন 'সাক্ষ্য আইন'। সংশোধনে আনা হয়েছে ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণের পাশাপাশি নানা পরিবর্তন।

আদালতের অনুমতি ছাড়া ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টা মামলায় জেরার সময় ভুক্তভোগীকে তার চরিত্র ও অতীত যৌন আচরণ নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না- এমন বিধান যুক্ত করে সংশোধনী গত বৃহস্পতিবার পাশ হয়। এ ছাড়া বিচারকাজে বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্যকেও সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ এই আইনে যোগ করা হয়েছে।

‘এভিডেন্স অ্যাক্ট ১৮৭২ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২২’ নামে এই বিলটি পাশের জন্য আইনমন্ত্রী আনিসুল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন। পরে বিলের ওপর দেওয়া জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে প্রেরণ ও সংশোধনী প্রস্তাবগুলো নিষ্পত্তি করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

এই সংশোধনী পাশ হওয়ার ফলে বিদ্যমান সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা বাতিল হবে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যখন ধর্ষণ কিংবা শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তখন দেখানো যেতে পারে যে অভিযোগকারী সাধারণভাবে দুশ্চরিত্রা।

পাশ হওয়া আইনে ক্রস এগজামিনেশন বা জেরার সময় প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টা মামলার ভিকটিমকে তার নৈতিক চরিত্র বা অতীত যৌন আরচণ নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। ন্যায়বিচারের স্বার্থে যদি আদালত মনে করেন এই ধরনের প্রশ্ন করা প্রয়োজন, তাহলে আদালতের অনুমতি নিয়েই কেবল তা করা যাবে।

মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই ঔপনিবেশিক আইনটি সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এ ছাড়া সাক্ষ্য আইনের বিভিন্ন ধারা সংশোধন ও নতুন ধারা যুক্ত করে মামলার বিচারে ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনেরও সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কেউ যাতে ভুয়া বা জাল সাক্ষ্যপ্রমাণ ডিজিটাল মাধ্যমে হাজির করতে না পারে, আদালত যদি মনে করেন যে কোথাও আপত্তিজনক কিছু আছে অথবা কেউ যদি আপত্তি তোলে, তাহলে ওই সাক্ষ্য-প্রমাণের ফরেনসিক পরীক্ষা করা যাবে।

বিরোধী দলের বেশিরভাগ সদস্যই আইন পাশের আলোচনায় অংশ নিয়ে এটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রশংসা করেন। তবে এর কোনো কোনো ধারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ব্যবহার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন বিএনপির সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।

রুমিন বলেন, এই আইনের খুবই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আইনটা কার হাতে থাকবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়েছে। দেখা যায়, সে আইনটি ব্যবহার করা হয় প্রতিপক্ষকে দমন করার কাজে। শুধু তাই নয়, এটি ভিন্ন মতাবলম্বী সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ফেসবুকারদের বিরুদ্ধে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। ডেটা সুরক্ষা আইন করা হচ্ছে, এটি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিঘ্নিত করবে।

রুমিন ফারহানা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সাক্ষ্য আইনে ডিজিটাল রেকর্ড সাক্ষ্য হিসেবে নেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে- তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। কারণ এখন ‘ডিপ ফেক’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে একজনের ছবির জায়গায় আরেকজনের ছবি ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করা যায়।

বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, যিনি আইন করছেন তিনিই প্রয়োগ করবেন। আজকে সরকার আইন করছেন, তা প্রয়োগ হবে বিরোধী দলের জন্য। দেশে এখন আইনের শাসন উঠে গেছে। বিরোধী দলকে দমন চলছে। সরকার আইন করছে তার নিজের কাজে ব্যবহারের জন্য। বিরোধীদের ওপর এ আইনে অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে, হাজার হাজার বিএনপি নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামমলায় ফাঁসানো হচ্ছে। নিজেদের স্বার্থে এবং বিরোধী দলকে দমন ও তাদের ওপর অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে।

বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, অপরাধীদের শাস্তির জন্য নানা আইন করেছি। যারা মিথ্যা তথ্য ও মিথ্য সাক্ষ্য দিয়ে মামলা দায়ের করছে, তাদের বিচারে দ্রুত বিচার আইন করার দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, বিরোধী দলের হাজার হাজার সদস্যদের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করছে। তাদের এই মামলার কারণে আমরা হয়রানির শিকার হচ্ছি। বিদেশে থাকার পরেও অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে।

দেশে আইনের শাসন বিদ্যমান কি না- মন্ত্রীর কাছে সেই প্রশ্ন রেখে বিএনপির এই এমপি বলেন, দেশে আইনের শাসন না থাকলে যতই ভালো আইন করি না কেন কাজে আসবে না।

জবাবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, এই আইনের একটি ধারা ছিল নারীদের জন্য অত্যন্ত কলঙ্কজনক। তা সংশোধন করা হচ্ছে যা নারীদের জন্য সম্মানজনক দেশের জন্য সম্মানজনক। মিথ্যা অভিযোগে মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, মিথ্যা অভিযোগে মামলা হতে পারে। কিন্তু কেউ মিথ্যা অভিযোগে মামলা করলে আইনে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করারও সুযোগ আছে। এখন আইনের মাধ্যমেই দেশ চলছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, সব আইনকেই অপব্যবহার করার একটা চেষ্টা থাকে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের অপব্যবহার হচ্ছে এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের অপব্যবহার শুধরানোর চেষ্টাও করা হচ্ছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে সংসদ সদস্য যিনি প্রশ্ন তুলেছেন তিনিও বলেছেন যে এইটা প্রয়োজন আছে এবং তিনি একটা কথা বলেছেন যে এইটার অপব্যবহার হয়েছে বা এই আইনটাকে বিরোধী দলকে টার্গেট করেই করা হয়েছে। কথাটা আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, সত্য নয়। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টকে সাইবার ক্রাইম কমব্যাক্ট করার জন্য করা হয়েছে। তার কারণ হচ্ছে আমরা জানি যে আমাদের এই সংবিধানে বলা আছে যে বাক-স্বাধীনতা বা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এটা একটা মৌলিক অধিকার। এর পরিপন্থী কোনো আইন হলে সংবিধানেই বলা আছে সে আইনটা কার্যকর হবে না।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের অপব্যবহার কিছু কিছু ক্ষেত্রে হচ্ছে- তা স্বীকার করে তিনি বলেন, হ্যাঁ- সব আইনকেই অপব্যবহার করার একটা চেষ্টা থাকে। কিন্তু আমাদের মধ্যে আর বিএনপির মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে যে যখন ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের অপব্যবহার হচ্ছে আমরা কিন্তু সেটা স্বীকার করেছি এবং সেটা শুধরানোর চেষ্টা করছি।

মন্ত্রী বলেন, আর উনারা (বিএনপি) ২১ বছর একটা হত্যা মামলার এফআইআর করতে দেন নাই, ইনডেমিনিটি অর্ডিনেন্স করেছেন ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫-এ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের সদস্যদেরকে ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছেন। কিন্তু একবার একটা শব্দ স্যরিও বলেন নাই। আমরা ভুল স্বীকার করি, আমরা জনগণের উপকারার্থে ভুলটাকে যেন ভালো করতে পারি জনগণের উপকারে আসে সে চেষ্টা করি। আমরা সব সময় মনিটর করি কিন্তু উনাদের মুখ দিয়ে কিন্তু অন্যায় করলেও অন্যায় ধরা পড়লেও উনারা ‘চোরের মার বড় গলা’।

নিউজের লিঙ্ক



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top