বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাজেটের ২ শতাংশ অর্থ গবেষণায় ব্যয়ের নির্দেশ

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৮ নভেম্বর ২০২২ ০৯:৫৭; আপডেট: ২৮ নভেম্বর ২০২২ ১০:৫৪

রাজটাইমস ডেস্ক

দেশের উচ্চশিক্ষায় গবেষণা বরাবরই উপেক্ষিত। বিশেষভাবে দেশের অর্ধেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন গবেষণা কার্যক্রম নেই। গবেষণ্ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে বার্ষিক বরাদ্দের ন্যূনতম ২ শতাংশ ব্যয় করার নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। খবর যুগান্তরের।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট পরিচালক মো. ওমর ফারুখ যুগান্তরকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যেসব শর্তসাপেক্ষে প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয় তার অন্যতম হচ্ছে গবেষণা খাতে অর্থ ব্যয় করতেই হবে। কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই এই ব্যয় দূরের কথা, বরাদ্দও রাখে না। এ কারণে কমিশন এ নির্দেশনা জারি করেছে।

২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৯ নম্বর ধারায় এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা বা সাময়িক পরিচালনার সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে মোট ৭টি শর্ত দেওয়া হয়। এর ৬ নম্বরটি হচ্ছে, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাৎসরিক বাজেটের ব্যয় খাতে কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত একটি অংশ গবেষণার জন্য বরাদ্দপূর্বক উহা ব্যয় করিতে হইবে।’

এ ব্যাপারে ১৫ নভেম্বর ইউজিসি জারিকৃত অফিস স্মারকে বলা হয়, ‘... কমিশন কর্তৃক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটে গবেষণা খাতে ন্যূনতম ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হলো। তবে বিশ্ববিদ্যালয়সমুহের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় কমিশন সময়ে সময়ে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উক্ত পরিমাণের বেশি যে কোনো যৌক্তিক পরিমাণ এ খাতে নির্ধারণ করতে পারে।’

দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৮৮ সালে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে। অধ্যাপক ড. সৈয়দ আলী আশরাফ ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করেন। এরপর সরকার ১৯৯২ সালে এ নিয়ে একটি আইন তৈরি করে। ওই আইনের অধীনে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম অনুমোদন পায়। সনদ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ আর গ্রুপিংয়ের কারণে উচ্চ আদালতে করা মামলার এক রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৩ দশকে দেশে ১০৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। সংখ্যাগত দিক থেকে যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে, সেইভাবে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে গবেষণা দূরের কথা, গবেষণায় হাতেখড়ি দিতে স্নাতক তৈরির জন্য যে গুণগত মানের শিক্ষা দেওয়ার কথা, সেখান থেকেও অনেক দূরে আছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে হাতেগোনা ডজনখানেক বিশ্ববিদ্যালয় সুনাম নিয়ে চলছে। আর বেশিরভাগের সুনামই নষ্ট হয়েছে নানা অভিযোগে। আইনে ‘অলাভজনক’ হলেও যারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে এসেছেন, তাদের বেশিরভাগের চোখ থাকে মুনাফার দিকে। ফলে গবেষণায় নজর নেই। অনেকটা পাঠদাননির্ভর হয়ে পড়েছে এসব বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশেষ করে অনার্সে পাঠদান নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে। এছাড়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান অর্থ কামানোর লক্ষ্যে বয়স্ক শিক্ষার্থীদের মাস্টার্সে ভর্তি করে থাকে, যাদের চাকরিতে পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধার জন্য মাস্টার্স ডিগ্রি দরকার। ফলে এসব শিক্ষার্থী দিয়ে গবেষণা হয়, শুধু কোর্স শেষ করানো হয়। তবে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পর্যায়ে এবং শিক্ষকদের দ্বারা কিছু গবেষণা কার্যক্রম চলছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের উল্লিখিত বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায় ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে। ২০২০ সালের বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের ওপরে সম্প্রতি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন বলছে, ওই বছর দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ১০৪টি। এর মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল ৯৬টিতে। ওই শিক্ষাবর্ষে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় থাকা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৫১টিতেই কোনো ধরনের গবেষণা কার্যক্রম ছিল না। এরচেয়েও ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে, ২০২০ সালে গবেষণা খাতে একটি টাকাও ব্যয় করেনি এমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১৭টি। এগুলোর মধ্যে আছে-সেন্ট্রাল উইমেন’স ইউনিভার্সিটি; দ্য পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি; বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়; ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; জেডএইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়; নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; রণদা প্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয়; দ্য ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স; রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়; সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি; আনোয়ার খান মডার্ন ইউনিভার্সিটি; জেডএনআরএফ ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস; বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়; ইন্টারন্যাশনাল স্টান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি; ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি। এগুলোর মধ্যে অবশ্য নবীন বিশ্ববিদ্যালয় আছে কয়েকটি, যেগুলোর ঠিকমতো অনার্স-মাস্টার্স পাঠদান ওই বছরে শুরু হয়নি।

উল্লিখিত সময়ে পিপলস বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক ড. একেএম সালাউদ্দিন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ক্যাটাগরি করা হলে তিন ধরনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এগুলো হচ্ছে-একেবারে নবীন, অল্পবয়স্ক আর বয়স্ক। প্রথম দুই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘গরিব বিশ্ববিদ্যালয়’ বলা যেতে পারে। অর্থের অভাবে এগুলো ঠিকমতো চলতেই পারে না, সেখানে তারা কীভাবে গবেষণায় ব্যয় করবে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা খাতে যে বরাদ্দ করে না তা নয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ করে। সেই টাকায় থাইল্যান্ড-সিঙ্গাপুরসহ বিদেশ সফর করেন অনেকে। এক কথায় বরাদ্দের এই টাকা কোথায় ব্যয় হয়, সেই হিসাব কে নেবে। তার মতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পাঠদানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলেও গবেষণা করা ও হওয়া সম্ভব। কেননা, অনার্সে যে গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা হয়, বিদেশে মাস্টার্স এবং এমফিল-পিএইচডি পর্যায়ে তারাই গবেষণায় মূল ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিত ও মানসম্পন্ন শিক্ষকদেরও গবেষণায় নিয়োজিত করে দেশ ও জাতির উপকারে আসে-এমন গবেষণা হওয়া সম্ভব। এটা ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষেই নিশ্চিত করা সম্ভব। তাই ইউজিসি ২ শতাংশ বরাদ্দের যে চিঠি দিয়েছে সেটি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এখন নিশ্চিত করতে হবে, গবেষণায় বরাদ্দের টাকা যেন অন্য কোনো খাতে ব্যয় করা না হয়। সিন্ডিকেটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ও ইউজিসির যে প্রতিনিধি থাকেন, তারা এ ক্ষেত্রে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।

যুগান্তরের প্রতিবেদনটির লিঙ্ক



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top