এ যাবৎকালের সবচেয়ে তীব্র গ্যাস-সংকট

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারী ২০২২ ০২:৩১; আপডেট: ১৯ জানুয়ারী ২০২২ ১৪:১৩

ছবি: প্রতীকী

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গ্যাসের সংকট শুরু হয়েছে। চাহিদার চেয়ে সরবরাহের পরিমাণ প্রায় ৪৩ শতাংশ কমে গেছে। আগামী দুই সপ্তাহ ঘাটতি আরও বাড়বে। এরপর ঘাটতি কিছুটা কমতে শুরু করার পূর্বাভাস থাকলেও চাহিদার এক-চতুর্থাংশের জোগান দেওয়া শিগ্গির সম্ভব হবে না। পরিস্থিতি সামলাতে কাতার ও ওমান থেকে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পরিমাণ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এমন প্রেক্ষাপটে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

এদিকে গ্যাসের সংকটে দেশের শিল্প উত্পাদন কমে গেছে। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উত্পাদনসক্ষমতার এক তৃতীয়াংশে নেমে গেছে। ফলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছে না শিল্প, বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানসহ শহর-গ্রামের নাগরিকেরা। উত্পাদনের চাকা ধীর ও বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিবহন খাতে রেশনিং করে সিএনজি সরবরাহ করায় বেড়ে গেছে যাতায়াতের খরচ। হ্রাস পেয়েছে কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সার উত্পাদনও।
গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় ঢাকা মহানগর, সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার বেশির ভাগ শিল্পকারখানা দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। শিল্পকারখানার মালিক ও কর্মকর্তারা বলছেন, পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই (প্রেশার পার স্কয়ার ইঞ্চি) থাকার কথা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে তিন-চার পিএসআই। এতে কারখানা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সক্ষমতা অনুসারে উত্পাদনে না থাকায় তারা আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটিং কারখানাগুলোর সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ঠিক সময়ে পণ্য দিতে না পারার ঝুঁকিতে থাকা রপ্তানিকারকেরা ক্রয়াদেশ বাতিলের আশঙ্কা করছেন।

তারা বলছেন, গ্যাস-সংকটের স্থায়ী সমাধান দরকার। আর এখনকার ঘাটতি দ্রুত মেটানো না গেলে অর্থনীতি ও বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া রাজধানীর রামপুরা, মিরপুর, ধানমন্ডি, হাতিরপুল, পুরান ঢাকা, শ্যাওড়া, যাত্রাবাড়ীসহ অনেক স্হানে বাসাবাড়িতে দিনের একটি বড় অংশে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও গ্যাস পাওয়া গেলেও তা সরবরাহ হচ্ছে ঢিমেতালে। রান্নায় বিকল্প উপায় অর্থাৎ এলপিজি, কেরোসিনের চুলা ও বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহারে সীমিত আয়ের মানুষ ইতিমধ্যে হিমশিম খেতে শুরু করেছেন।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে দৈনিক ৪৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে ২৫০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। গত দুই-তিন বছর ধরে দৈনিক ৪১০-৪৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ৩১০-৩৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। অথচ গত ৯ জানুয়ারি ২৫৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। গত ১৮ নভেম্বর সামিটের এলএনজি টার্মিনালের মুরিং ছিঁড়ে যায়। এতে টার্মিনালটিতে কোনো এলএনজিবাহী কার্গো ভিড়তে পারছে না। এতে দৈনিক প্রায় ৪০-৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। চলতি মাসের শেষ বা আগামী মাসের শুরুর দিকে এটি ফের চালু না হওয়া পর্যন্ত দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস ঘাটতি কমানো যাবে না। এর মধ্যে গতকাল বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে কূপ সংস্কারের জন্য প্রতিদিন ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ২১ জানুয়ারিতে এই সংস্কার শেষ হলে আগের চেয়ে কিছু বেশি গ্যাস পাওয়া যাবে। সব মিলিয়ে গ্যাসের বিদ্যমান সংকটের তীব্রতা চলতি জানুয়ারিতে কমছে না।

পেট্রোবাংলার সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তা জানান এবং গ্যাস উত্পাদনের রিপোর্ট বিশ্লেষণেও দেখা যায়, চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি বিবেচনায় এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র গ্যাসের সংকট। জ্বালানি খাতের শীর্ষ সংস্থা পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বলেন, দেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্পাদন কমে যাওয়ায় এবং এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ঘাটতি বেড়েছে। পরিস্থিতি উন্নতির সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। কয়েকটি গ্যাসকূপের ওয়ার্কওভার (সংস্কার) শেষ হওয়ার পথে। সেগুলোতে উত্পাদন শুরু হলে এবং উত্পাদন বাড়লে সংকট কমবে। সামিটের এলএনজি ফের চালু হলেও সরবরাহ বাড়বে। এক্ষেত্রে এই খাতে সরকারের ভতু‌র্কি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গত বুধবার তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে উল্লেখ করেছেন, কারিগরি কারণে ১২ থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত তিতাস গ্যাস অন্তর্গত এলাকায় গ্যাসের স্বল্প চাপ বিরাজ করতে পারে। এজন্য তিতাস দুঃখ প্রকাশ করছে। সংকট তীব্র হওয়া শুরু যেভাবে দেশে দেড় যুগের বেশি সময় ধরে কমবেশি গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। উত্পাদন-বিনিয়োগ যে হারে বেড়েছে, সেই হারে স্থানীয় উত্পাদন বা অন্য দেশ থেকে আমদানি করায় দেশে গ্যাসের প্রমাণিত ও সম্ভাব্য মজুত কমে এখন প্রায় ১০ টিসিএফে ঠেকেছে। এলএনজি আমদানি শুরুর পর পরিস্হিতির উন্নতি হবে মনে করা হলেও তা হয়নি। গত দুই-তিন বছর ধরে চাহিদার চেয়ে জোগানের ঘাটতি ৮০-১০০ কোটি ঘনফুটের সঙ্গে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত নিরুপায় হয়ে মানিয়ে নিলেও এখনকার প্রায় ১৮০-১৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সংকটে বিপাকে পড়েছেন তারা। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় গত জুন মাস থেকে এলএনজি আমদানি কম হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উত্পাদনও কমেছে। এর মধ্যে সামিটের টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ এবং বিবিয়ানায় কূপ সংস্কারের কারণে দৈনিক ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া সংকট প্রকট হয়েছে।

সম্প্রতি পেট্রোবাংলার এক সভায় জানানো হয়, এলএনজি আমদানি করে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে চলতি বছরে বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং সারে ৭০ হাজার কোটি টাকার ভতু‌র্কি প্রয়োজন। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিম বলেন, দেশীয় গ্যাসের মজুত-উত্পাদন কমছে। আবার অনুসন্ধানেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এলএনজি আমদানি করতে হবে। কিন্তু নির্ভরতার মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে।

পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক হোসেন মনসুর বলেন, বিদ্যমান সমস্যার দ্রুত সমাধান নেই। স্থলভাগে অনুসন্ধানকাজ দ্রুততর করতে হবে। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের যে চ্যালেঞ্জ, তা যত দ্রুত সম্ভব কাটিয়ে উঠতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু আমদানি করে সমস্যা নিরসন করা যাবে না। দাম বাড়িয়ে সরবরাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্পসহ সব ধরনের গ্যাসের দাম বাড়ার চূড়ান্ত প্রস্তাব আগামী সপ্তাহে জমা দিতে যাচ্ছে দেশের গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানায়, গত তিন দিনে কয়েকটি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও তা বিধিসম্মত না হওয়ায় ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব পাওয়ার পর শুনানি শেষে দাম বাড়ানোর বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত বলে জানিয়েছেন বিইআরসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে আপাতত আমদানির বিকল্প নেই। তাতে খরচ অনেক। তাই দাম বাড়াতে হবে।

সূত্র: ইত্তেফাক



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top