প্রত্যাশী যোগ্য প্রার্থী দেড় লাখ

শিক্ষক নিয়োগ: ৬৮ হাজারের মধ্যে ৩৬ হাজার পদই

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ২১ মার্চ ২০২৩ ১৪:৩৬; আপডেট: ১৭ জুন ২০২৪ ০৬:০৪

ছবি: সংগৃহীত

সরকারি হিসাবে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের শূন্য পদ আছে ৬৮ হাজার ১৬৭। আর চাকরিপ্রত্যাশী যোগ্য প্রার্থী আছেন দেড় লাখের মতো। কিন্তু এর পরও ৫২ শতাংশের বেশি পদে কাউকে নিয়োগের সুপারিশ করতে পারেনি জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। গত ২১ ডিসেম্বর এসব শূন্য পদে নিয়োগের লক্ষ্যে দরখাস্ত আহ্বান করেছিল সংস্থাটি। ১২ মার্চ ওই আবেদনের ফল প্রকাশ করা হয়। খবর যুগান্তরের। 

এদিকে আবেদন করেও নিয়োগের সুপারিশ না পাওয়ায় প্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। এক সপ্তাহ ধরে বঞ্চিত প্রার্থীরা এনটিআরসিএতে ধরনা দিচ্ছেন। তাদের বেশিরভাগের দাবি-অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী বা মেধাক্রমে নিচে থাকা প্রার্থীদের চাকরি দেওয়া হয়েছে।

ইনডেক্সধারী প্রার্থীদের (চাকরিরত) ঠেকাতে গিয়ে তাদেরও ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও কিছু ভুল করেছে সংস্থাটি। নিয়োগের দাবি জানিয়ে তারা কর্তৃপক্ষকে স্মারকলিপি দিচ্ছেন। এমন ২৩ জনের একটি গ্রুপ রোববার এনটিআরসিএ চেয়ারম্যানকে দেওয়া স্মারকলিপিতে ‘রোল নম্বর ব্লকজনিত’ কারণে বাদ পড়ার কথা উল্লেখ করেন। এ কারণে মেধাক্রমের ভিত্তিতে তারা দ্রুত নিয়োগের সুপারিশ করার দাবি করেন। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রার্থীরা ইতিবাচক কোনো সাড়া পাচ্ছেন না বলে জানান।

জানতে চাইলে সংস্থাটির সচিব মো. ওবায়দুর রহমান  জানান, প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও শূন্য থাকা ৩৫ হাজার ৭২৯টি পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর কারণ হচ্ছে ওইসব পদে কোনো যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি। আবার কোনো কোনো পদে একাধিক প্রার্থী আবেদন করেছে। ফলে মেধাক্রমে নিচে থাকা প্রার্থীরা ঝরে পড়েছে। কিন্তু ইনডেক্সধারীদের বাদ দিতে গিয়ে ফ্রেশ (চাকরি না পাওয়া) প্রার্থী বাদ পড়ার অভিযোগ তারাও পেয়েছেন। কিন্তু অভিযোগ সঠিক কিনা তা যাচাই করে দেখতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশের স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৬৮ হাজার ১৬৭টি শিক্ষকের শূন্য পদে আবেদন নেওয়া হয়। এর মধ্যে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ৩১ হাজার ৫০৮ জন এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ৩৬ হাজার ৮৮২ শূন্য পদ ছিল। বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩৫ বছর বয়সিরা এসব পদে আবেদন করতে পারেন। এখন পর্যন্ত নেওয়া বিভিন্ন নিবন্ধন পরীক্ষায় যেসব প্রার্থী পাশ করেছেন তাদের মধ্যে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৪৮ জন চাকরি পাওয়ার যোগ্য।

কিন্তু অন্তত এক লাখ প্রার্থী ইতোমধ্যে চাকরি পেয়ে গেছেন বলে এনটিআরসিএ মনে করছে। সেই হিসাবে চাকরিপ্রত্যাশী দেড় লাখ থাকলেও সবাই আবেদন করেনি। তাই যে ৩৫ হাজার ৭২৯টি পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি, সেগুলোর বিপরীতে চাকরি না পাওয়া বা বঞ্চিত প্রার্থী অন্তত ৮০ হাজার বলে জানা গেছে।

এনটিআরসিএ সূত্র জানায়, প্রার্থী নিয়োগ দিতে না পারা শূন্যপদের বেশিরভাগই হচ্ছে ইংরেজি, আইসিটি, বিজ্ঞান, মাদ্রাসার সহকারী মৌলভি এবং নারী কোটার সংরক্ষিত পদ। আবার কিছু পদে কোনো প্রার্থীই পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে ইংরেজি বিষয়ে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার পদ শূন্য থাকলেও ৪ হাজারের মতো আবেদন পড়েছে।

বিজ্ঞান বিষয়ে প্রায় ১০ হাজারের বিপরীতে সাত হাজার আবেদন পড়েছে। আইসিটি বিষয়ে আবেদন পড়েছে ৩১০০। এরপরও ৯শর বেশি পদ শূন্য। এভাবে মাদ্রাসায় মৌলভি পদে সাড়ে তিন হাজার ও নারী কোটায় ১৪ হাজারের বেশি পদ শূন্য রয়ে গেছে।

ওই সূত্র আরও জানায়, উল্লিখিত পরিস্থিতি সৃষ্টির যেসব কারণ আছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-প্রথমবারের মতো এবার চাকরিরত ইনডেক্সধারী শিক্ষকদের আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। কেননা প্রতি বিজ্ঞপ্তিতে সনদধারী সবার আবেদনের সুযোগ ছিল। আরও দেখা গেছে, বেকাররা বেকারই থাকছে। বিপরীত দিকে চাকরিরতদের বেশিরভাগ পুনঃনিয়োগ পাচ্ছে। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, তৃতীয় বিজ্ঞপ্তিতে ৩৪ হাজার প্রার্থী নিয়োগ পান।

তাদের মধ্যে ইনডেক্সধারী বা আগে থেকে চাকরি করা প্রার্থীই ছিল ২১৮৭৩ জন, যা দুই-তৃতীয়াংশ। বাকি ১৪৬৬৭ জন নতুন সুপারিশপ্রাপ্ত। পুরোনো নতুন পদে ফের যোগদান করায় সমসংখ্যক পদ প্রকারান্তরেই খালি হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক সংকটে ভুগতে থাকে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পদ শূন্যতায় এবার রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। কেননা তৃতীয় বিজ্ঞপ্তিতে ৫৪ হাজার পদে আবেদন নিয়ে প্রথম ধাপে ৩৪ হাজার সুপারিশ করা সম্ভব হয়েছিল। দ্বিতীয় এবং বিশেষ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বাকি পদে নিয়োগ করা হয়। কিন্তু এবার এই শূন্য পদের হার ৫২ শতাংশের বেশি।

শাহরিয়ার আল আমিন নামে রসায়নে শিক্ষক নিয়োগ প্রার্থী বলেন, তার মেধাক্রম ৪৩৪০। কিন্তু তার এক নম্বর পছন্দের প্রতিষ্ঠানে যিনি চাকরির সুপারিশ পেয়েছেন তার মেধাক্রম ৫৭৯১। এভাবে তার পছন্দের তালিকায় থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানেও কম মেধাক্রমের প্রার্থীদের সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি জানান, এর কারণ অনুসন্ধান করে তিনি জানতে পারেন, যে কয়টি কারণে তিনি নিয়োগ পাননি তার অন্যতম হচ্ছে-বাছবিচার ছাড়া ঢালাওভাবে একই নামের ব্যক্তিদের রোল ব্লকড (বন্ধ) করা হয়েছে। চাকরিরত প্রার্থী ভেবে করা ওই কাণ্ডের শিকার তিনি। এভাবে কয়েকশ প্রার্থী বঞ্চিত হয়েছে।

রোববার সরেজমিন দেখা গেছে, বেশকিছু প্রার্থী নানা ধরনের অভিযোগ নিয়ে এনটিআরসিএতে গেছেন। বলতে গেলে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। তারা নিয়োগের সুপারিশে অসঙ্গতি ও ভুল-ভ্রান্তি সংশোধনের দাবি জানান। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানসহ দায়িত্বপ্রাপ্তদের বেশিরভাগই ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎ দিচ্ছেন না। এমনকি সাংবাদিকরাও গিয়ে ফিরে আসছেন। ভুক্তভোগীরা জানান, শিক্ষা ক্যাডার থেকে প্রশাসন ক্যাডারে আসা চেয়ারম্যানের ব্যবহার সন্তোষজনক নয়। তিনি কারও ফোনও ধরেন না। সাক্ষাৎও দেন না। তার অযোগ্যতার কারণেই যোগ্য প্রার্থী থাকার পরও পদ শূন্য থেকে যাচ্ছে। তারা আরও জানান, চাকরিরতদের ঠেকানোর প্রকল্প নেওয়া সত্ত্বেও তা ঠেকাতে পারেনি। বিশেষ করে কারিগরি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রার্থী নিয়োগ পাওয়ার ঘটনা বেশি।

এনটিআরসিএ সূত্র জানায়, উল্লিখিত ভুলের বিষয়টি এখনো নির্ণয় করা হয়নি। তবে নিয়োগের কাজ সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। কারিগরি ভুলের কারণে উল্লিখিত সমস্যা তৈরি হতে পারে।

যোগাযোগ করেও এসব বিষয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান এনামুল কাদের খানের সঙ্গে। তবে সংস্থাটির সচিব বলেন, ব্লক করা সত্ত্বেও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে কিছু চাকরিরত প্রার্থী ফের সুপারিশ পেয়েছে। এগুলো যাচাই করা হবে।



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top