শহর রক্ষা বাঁধসহ প্রকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে
রাজশাহীতে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ ছাড়াই বালু উত্তোলন
নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ৫ এপ্রিল ২০২৫ ১৮:১০; আপডেট: ৬ এপ্রিল ২০২৫ ০৬:১৪

রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধের অদূরে চলছে নিয়মনীতি বহির্ভূত বালু উত্তোলন। এতে করে শহর রক্ষা বাঁধসহ নদী প্রবাহ ও জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়ছে। এদিকে দীর্ঘ এক যুগ ধরে হাইড্রেগ্রাফিক জরিপ ছাড়াই বালু মহাল ইজারা দিয়ে যাচ্ছে প্রশাসন। অথচ নদীর শাসন ও পদ্মা পাড়ের ভূমি উদ্ধারে কোন নীতিমালার তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রকৌশলীসহ পরিবেশবিদগণ।
রাজশাহীর পদ্মা নদীতে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১১ এর তিন নম্বর ধারা অনুযায়ী হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ করে বালি উত্তোলনের নির্দেশনা রয়েছে। অথচ মরা পদ্মায় হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ না করেই বালি উত্তোলন চলছে। যার কারণে শহররক্ষা বাঁধ হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। একই সাথে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ, গতিপথ, জলজ পরিবেশ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হবার পাশাপাশি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। রাজশাহীর পবা উপজেলার চরশ্যামপুর ও দিয়ার খিদিরপুরে দীর্ঘ একযুগের বেশী সময় ধরে অবৈধ বালু মহাল ইজারা দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। রাহেল সরদার নামে এক ব্যক্তির সরকারের বিপক্ষে হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের করা বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমাল-২০১১ এর ৩ নং ধারা অনুযায়ী হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ না করে না করে ইজারা দেয়ার রিট পিটিশনের জবাবে রাজশাহীর ডিসি (সাবেক) শামীম আহমেদ ২০২৩ সালের পহেলা জুন নথিবদ্ধ করে লেখেন, ‘বালু মহাল সমূহ ইজারা প্রদানের মাধ্যমে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমানে রাজস্ব আয় করে। উক্ত বালুমহাল থেকে উত্তোলনকৃত বালু দ্বারা মুজিববর্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভূক্ত আশ্রয়ন-২ প্রকল্পের আওতায় গৃহনির্মাণসহ রাজশাহী জেলার সরকারি ও বেসরকারি অসংখ্য উন্নয়নমূলক কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয়ে থাকে।
’ সেখানে বলা হয়,‘ ইজারাদার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড রাজশাহী কর্তৃক হাইডোগ্রাফিক জরিপের সুপারিশ করা হয়নি। কিন্তু রাজশাহী জেলায় বিআইডব্লিউটি এর নির্ধারিত নৌ-বন্দর সীমানা বা নির্ধারিত নৌপরিবহনের কোন কোন রুট না থাকায় এবং উক্ত কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যালয় না থাকায় বালুমহাল ইজারা প্রদান বা বালু উত্তোলনের জন্য বিআইডব্লিউটি এর হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ পরিচালনার সুপারিশ না থাকায় এখানে হাইড্রোগ্রাফিক চার্টের ভিত্তিতে বালু উত্তোলনের জন্য কখনও ড্রেজিং এলাকা চিহ্নিত করণের প্রয়োজন হয়নি।’
অন্য একটি রিট মামলার আদেশে হাইকোর্ট পদ্মার তালাইমারী ঘাট, কাজলা ও বাজেকাজলা ঘাট ব্যবহার করে বালু উত্তোলন, মজুত ও পরিবহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। হাইকোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে রাজশাহী জেলা প্রশাসনও অবৈধ তালাইমারী ঘাটের ওপর সাইনবোর্ড টানিয়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় ইজারাদার পরিবর্তন করে ঐ সাইনবোর্ড থাকা অবস্থায় আবারো বহাল করা হয় বালু মজুদ ও পরিবহন। এ বিষয়ে প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব রাজশাহীর মহানগর সম্পাদক রওশন আলী খান বলেন, অবিলম্বে তা বন্ধ করা উচিৎ। কারণ অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীর প্রবাহ নষ্ট হয়, জীব বৈচিত্র হুমকির মুখে পড়ে। বিশিষ্ট নদী গবেষক ও পরিবেশবিদ মাহাবুব সিদ্দিক বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে শহর এবং শহর রক্ষা বাঁধের কাছাকাছি কোথাও কোন বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না, এটি আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত বিশেষজ্ঞদের দিয়ে হাইড্রোগ্রাফিক টেস্ট করে নদীর শাসন এলাকা বা সীমানা নির্ধারণ করা উচিৎ। তা না হলে ভবিষ্যতে পদ্মা নদীর প্রবাহ নষ্ট হয়ে যাবে।
রাজশাহী শহর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাত খান বলেন, শহর রক্ষা বাঁধের আশপাশে বৈধ বা অবৈধ সকল প্রকার বালি বা মাটি উত্তোলন ও খনন বন্ধ করে দেয়া উচিৎ। এরকম চলতে থাকলে যে কোন সময় বালু ধ্বস, ভূমি ধ্বস এবং শহর রক্ষা বাঁধ ধ্বসে যেতে পারে। এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহীর সভাপতি আহমেদ শফিউদ্দিন বলেন, স্বাধীনতার পর একটি কমিটি করা হয়েছিল; পদ্মা নদীর তীরবর্তী ভূমি উদ্ধার করে নদী শাসন এলাকা তৈরী করা। পরে অদুরে ড্রেজিং করে নদী পথ সচল রাখা। বালু উত্তোলন তো পরের কথা, জমি উদ্ধার করে টি-বাঁধের মতো বাব নির্মাণ করে, শহরক্ষা বাঁধের সংস্কার করতে হবে। আগের কাজগুলো আগে করতে হবে, না হলে এ শহর ভবিষ্যতে ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: