বিলুপ্ত প্রায় কাশিমপুর রাজবাড়ি

এককালের রাজবাড়ি, এখন গোয়ালঘর

মহিব্বুল আরেফিন | প্রকাশিত: ১৪ মে ২০২১ ২১:১৬; আপডেট: ৭ জুন ২০২১ ১৬:১৩

সংস্কার-সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্ত প্রায় কাশিমপুর রাজবাড়ি

কাশিমপুর রাজবাড়ি সংরক্ষণের অভাবে প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। কাশিমপুর রাজবাড়ি রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার রাণীনগর উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক একটি রাজবাড়ি। স্থানীয় ভাবে রাজবাড়িটি পাগলা রাজার বাড়ি নামেও পরিচিত।

রাণীনগর উপজেলা থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে ছোট যমুনা নদীর তীরের কাশিমপুর ইউনিয়নের কাশিমপুর নামক গ্রামে প্রাচীন রাজবাড়িটি অবস্থিত। বর্তমানে এটি গোয়ালঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রাজবাটির প্রধান ফটকের কিছু অংশ আর ভগ্নপ্রায় মন্দির দাঁড়িয়ে আছে।

  শত বছরের ইতিহাস মাথায় নিয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার একমাত্র ঐতিহাসিক স্থাপনা কাশিমপুর রাজবাড়ি

ইতিহাস
কথিত আছে, নাটোরের রাজার উত্তরসূরি কাশিমপুরের পাগলা রাজা রাজবাড়িটি নির্মাণ করেন। নওগাঁ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার শাসনকাজ পরিচালনা করার জন্যই এই রাজবাড়ি নির্মাণ করা হয়। এ অঞ্চলে রাজার শাসনকাল কখন থেকে শুরু হয় তার তারিখ জানা যায়না। তবে অন্নদা প্রসন্ন লাহিড়ী বাহাদুর এই অঞ্চলের শেষ রাজা ছিলেন এবং তার চার ছেলে ও একজন মেয়ে ছিল এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। অন্যত্র শেষ রাজার নাম আনামী প্রাসাদ রায় চৌধুরী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের কিছুকাল পরে, রাজবংশের প্রায় সবাই দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। তবে ছোট রাজা শক্তি প্রসন্ন লাহিড়ী ও তার পরিবার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত এই রাজবাড়িতে বসবাস করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনিও রাজবাড়ি ছেড়ে ভারত চলে যান।

স্থাপত্য
তথ্য উপাত্ব থেকে জানা যায়, রাজবাড়িটি প্রায় ২ একর ১৯ শতক এলাকা জুড়ে অবস্থিত। রাজবাড়ির মূল ভবনের মাঝখানে চারটি গম্বুজ বিশিষ্ট একটি দুর্গা মন্দির ছিল। রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে চুন, সুড়কি ও পোড়ামাটির ইট দিয়ে শিব, রাধাকৃষ্ণ ও গোপাল মন্দির নির্মিত। রাধাকৃষ্ণ মন্দিরটি অন্যান্য মন্দিরগুলোর চেয়ে বেশি উচ্চতা বিশিষ্ট ছিল। দুর্গা মন্দিরের একপাশে রাজার বৈঠকখানা ছিল। মূল ভবনের পাশে একটি হাওয়াখানা ছিল। পুকুরপাড় ও নদীর ধারে কাঁচের ঘরের তৈরি একটি বালিকা বিদ্যালয় ছিল। বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে প্রাচীন রাজবাড়িটির কারুকার্যগুলো প্রায় ধ্বংশ হয়ে গেছে। রাজবাড়ির কিছু অংশ কাশিমপুর ইউনিয়নের ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয় আর মন্দিরগুলোতে সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ পূজাঅর্চনা ও বসবাস করেন।

  প্রভাবশালীদের দখলে নামে বেনামে অসংখ্য ধানের চাতাল।

বর্তমান অবস্থা
কশিমপুর রাজার শতাধীক বিঘা জমি ও পুকুর স্থানীয় প্রভাবশালীরা বিভিন্ন কায়দা-কৌশলে দখলে রেখেছেন স্থানীয়দের অভিযোগ। রাজবাড়ির বেশির ভাগ জায়গা অবৈধভাবে দখলে নিয়ে বিভিন্ন পন্থায় উপজেলা ভূমি অফিস ও জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে লিজ নিয়ে চাতাল তৈরি করে ব্যবসা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া উঁচু জমি কেটে সমতল করে ধান চাষ করা হচ্ছে। যথযথ পদক্ষেপ না থাকার কারণে রাজবাড়ি ও রাজার সম্পদ থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

সম্ভাবনা
কাশিমপুর রাজবাড়ি এবং তার বিপুল পরিমাণ সম্পদ যথাযথভাবে সংস্কার আর সংরক্ষণ করে এলাকাটি ঘিরে গড়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র। পাশপাশি সকল জমি পুনোরদ্ধার করে স্বচ্ছ প্রকৃয়াতে লিজ দেয়া হলে সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করা সম্ভব।

  ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক স্থাপনা কাশিমপুর রাজবাড়ি
স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য
কাশিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান বাবু এক সাক্ষাতকারে বলেন, সংরক্ষণের অভাবে রাজবাড়িটি আজ মৃতপ্রায়। যতটুকু নির্মাণশৈলী কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর তা যদি রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার করে তাহলে এখানেও গড়ে উঠতে পারে দর্শনীয় স্থান।
নির্বাহী কর্মকর্তা সুশান্ত কুমার মাহাতো বলেন, স্থানীয়ভাবে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তবে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এসব নিদর্শনগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব পালন করে থাকে। আমি রাজবাড়ির অবশিষ্ট এ নিদর্শন রক্ষা করার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানাবো। আর নতুন করে কাউকে জায়গা লিজ দেওয়া হবে না। যে সব জায়গা লিজ দেওয়া আছে, তা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবো।

তথ্য সূত্র ও ছবি:
০১. কাশিমপুর রাজবাড়ি-উইকিপিডিয়া।
০২. রাণীনগরের কাশিমপুর রাজবাড়ি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে                                                দৈনিক সংগ্রাম- প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ।
০৩. ধ্বংসের মুখে কাশিমপুর রাজবাড়ি- ডেইলী বাংলাদেশ। ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮।
০৪. কাশিমপুর রাজবাড়ি ধ্বংসের মুখে- বাংলাদেশ প্রতিদিন। প্রকাশ- ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
০৫. ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী কাশিমপুর রাজবাড়ি                                       ঢাকা ট্রিবিউন- ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
০৬. ঐতিহাসিক রাজবাড়ি এখন গোয়ালঘর- ঢাকা পোস্ট। প্রকাশ-৩ এপ্রিল ২০২১।  
০৭.  কাশিমপুর রাজবাড়ি এখন গোয়ালঘর- দৈনিক ইত্তেফাক। প্রকাশ- ১১ মে ২০২১।  ০৮. অন্যান্য।




বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top