সবজির বিষে বিষাক্ত পরিবেশ

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারী ২০২২ ০২:৫৫; আপডেট: ১৯ জানুয়ারী ২০২২ ১৪:৪৬

ছবি: প্রতীকী

ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের আমিনুর রহমান বাবু ২১ বছর ধরে শিম চাষ করছেন। এলাকায় এখন তিনি 'শিমবাবু' নামেই পরিচিত। তবে প্রথম দিককার সবজি আবাদের সঙ্গে বর্তমানকে মেলাতে পারছেন না তিনি। আগে সপ্তাহে একবার কীটনাশক স্প্রে করলেই কীটপতঙ্গ সাবাড় হতো। কিন্তু এখন পাঁচবার ছিটালেও ঠিকমতো মরে না।

ঈশ্বরদীর বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামের পর গ্রাম কৃষক এখন শীতকালীন সবজি আবাদে ব্যস্ত। এখান থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক সবজি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। শিম, ফুলকপি, ঢ্যাঁড়শ, বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি আবাদ হয় এখানে। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে জানা গেছে, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ছিটানো ছাড়া এখন সবজি উৎপাদনই কঠিন। আবার বিষে ভেজালের কারণে পোকামাকড়ও দমন হয় না। বারবার বিষ প্রয়োগের কারণে আবাদে খরচও বেড়েছে অনেক।

মুলাডুলি ইউনিয়নে গ্রামের পর গ্রাম শিম আবাদ হয়। শিমের ফুল ও কচি শিমের জাবপোকা দমন করতে সপ্তাহের পাঁচ দিনই টাফগড় নামের কীটনাশক স্প্রে করা হয়। কোনো কোনো জমিতে পোকার আক্রমণ বেশি হওয়ায় দিনে দু'বার বিষ প্রয়োগ করেন কৃষকরা। এই ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার বাতাসেও এখন বিষের গন্ধ। শিম চাষি আমিনুর বলেন, এ বিষের গন্ধ খুব তীব্র। বিষের কারণে জমির পাশাপাশি গ্রামের পরিবেশও বিষাক্ত হয়ে উঠছে। জমির আশপাশে, রাস্তায় এমনকি বাড়িঘরেও সবসময় বিষের গন্ধ অনুভূত হয়। তবে কীটনাশক স্প্রে না করলে কোনো সবজি পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না।

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, দেশে সবজি উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে ঈশ্বরদী। সবজি চাহিদার প্রায় ২০ ভাগ জোগান দেয় ঈশ্বরদী। এ বছর পাবনা জেলায় সবজি আবাদ হয়েছে ২৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে। এর বড় অংশই ঈশ্বরদীর। আবহাওয়া ও মাটি সবজি চাষের উপযোগী হওয়ায় প্রতিবছরই এ এলাকায় আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু কৃষক ভালো ফলনের আশায় সবজি চাষে ব্যবহার করছেন সার ও অতিরিক্ত কীটনাশক। বিশেষ করে শীতকালীন সবজি শিম, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি চাষে ব্যবহার করা হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক।

মুলাডুলি ইউনিয়নের মুলাডুলি, শেখপাড়া ও আটঘোরিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বিষের উৎকট গন্ধে পথ চলতে নাকে রুমাল দিতে হয়। কয়েকজন কৃষক জানান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা দিনে দু'তিনবারও কীটনাশক প্রয়োগ করছেন।

বিষে বিপন্ন জীবন :বারবার কীটনাশক স্প্রের কারণে আমিনুরের মতো অনেক কৃষক ও কৃষি শ্রমিকের শরীর ঠিক রাখতে বাড়তি পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু তা কেনার জন্য বাড়তি অর্থ সব সময় না থাকায় শরীরও ঠিক রাখতে পারেন না তারা। এলাকার আব্দুল হামিদ, দুলাল হোসেন, আব্দুল কাদেরসহ অন্তত শতাধিক কৃষি শ্রমিক ২০-২৫ বছর ধরে কৃষি জমিতে কীটনাশক স্প্রে করার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

কীটনাশক ছিটানোর কাজ করতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই অনেকে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবে কীটনাশক ব্যবহারের এই পেশায় স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে তাদের কোনো সচেতনতা নেই।

আমিনুর জানান, এক বিঘা জমিতে শিম, ফুলকপি কিংবা বেগুন আবাদ করতে ৯ থেকে ১১ হাজার টাকা খরচ গুনতে হয় শুধু কীটনাশক বাবদ। টাফগড়, ফ্যানথেন, দানাদার, সুমিথিয়ন, ওকোজিমসহ নানা ধরনের কীটনাশক নিয়মিত জমিতে স্প্রে করতে হয়। এসব বিষের মধ্যে দানাদার স্প্রে করার সময় শরীরের লোমকূপ দিয়ে অসাবধানতায় বিষ শরীরে প্রবেশ করায় কৃষি শ্রমিকদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন, এমনকি জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেন। চিকিৎসার পর তারা সুস্থ হয়ে আবারও ফিরে যান একই কাজে।

সাঁড়াগোপালপুর গ্রামের কৃষক তৌফিক আলম সোহেল জানান, এ এলাকায় এছের আলী চৌধুরী নামের একজন কৃষক সম্প্রতি কীটনাশক স্প্রে করার সময় জ্ঞান হারিয়ে মৃত্যুর মুখে পড়েছিলেন। উপজেলার মুলাডুলি, সাঁড়াগোপালপুর, সাহাপুর, সলিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে অর্ধশতাধিক কৃষক ও কৃষি শ্রমিক জমিতে কীটনাশক স্প্রে করার সময় বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরেছেন।

স্থানীয় কীটনাশক বিক্রেতা তৌফিক আলম বলেন, এ এলাকায় সিমিক্র, টিডো পল্গাস, ভিরতাকো, সবিকরন, কট, ফাইটার, মাস্টার, ব্রিফার, প্রোটেক্ট, গ্রিনফুরানসহ প্রায় ২০ ধরনের কীটনাশক বিক্রি হয়। বিভিন্ন এলাকার সার ও কীটনাশক বিক্রেতারা বলেন, এক-দুই বছর আগের তুলনায় ঈশ্বরদীতে কীটনাশক বিক্রি বেড়েছে দ্বিগুণ। আগে গ্রামের একটি ছোট্ট দোকানে প্রতিদিন তিন-চার হাজার টাকার কীটনাশক বিক্রি হতো। এখন সেসব দোকানেই ৮-১০ হাজার টাকা আয় হয়। সাহাপুর ইউনিয়নের আওতাপাড়া বাজারের কীটনাশক বিক্রেতা আরিফ হোসেন খান বলেন, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এখন সার ও বিষ বিক্রি দ্বিগুণ হচ্ছে।

যেসব গ্রামে সবজি আবাদ বেশি, সেখানে মুদি দোকানেও বিক্রি করা হয় কীটনাশক। এ ধরনের এক মুদি দোকানি আজিজুর রহমান জানান, গ্রামের ছোট কৃষকরা চাল-ডাল, তেল, লবণ কিনতে এসে জমিতে দেওয়া কীটনাশক চান, সে কারণে তিনি দোকানে দু-তিন ধরনের কীটনাশক রাখেন। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, পৌর এলাকা ও বিভিন্ন গ্রাম মিলিয়ে ঈশ্বরদীতে এখন কীটনাশক বিক্রির দোকানের কোনো হিসাব নেই। ব্যাঙের ছাতার মতো যেখানে-সেখানে বিক্রি করা হয় প্রাণঘাতী কীটনাশক।

ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকি :মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার দিনে দিনে স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়ছে। কীটনাশকে উৎপাদিত সবজি মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর উল্লেখ করে কৃষক ও ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কৃষি বিভাগ বলছে, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে কৃষকদের সচেতন করতে কাজ করছেন তারা।

ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শফিকুল ইসলাম শামীম বলেন, কীটনাশকে উৎপাদিত সবজি মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এসব সবজি খেলে ক্যান্সার হতে পারে, কিডনি ও লিভার ড্যামেজ, বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম, বন্ধ্যত্বসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে মানুষ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পাবনার অতিরিক্ত উপপরিচালক আব্দুল লতিফ বলেন, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার থেকে দূরে থাকতে নানাভাবে কৃষকদের সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন তারা। তাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিজ নিজ ব্লকে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন। ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিতা সরকার বলেন, তারা চেষ্টা করছেন কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে। এরই মধ্যে দু-তিনটি গ্রামে কীটনাশক ছাড়া সবজির ফলন বাড়ানোর পদ্ধতি কয়েকজন কৃষককে হাতে-কলমে শিখিয়েছেন তারা। এর মাধ্যমে বিষমুক্ত সবজি আবাদে আগ্রহী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সূত্র: সমকাল



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top