নুসরাত ফতেহ আলী খান উপমহাদেশের কিংবদন্তী

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট ২০২২ ১৯:৫০; আপডেট: ১ ডিসেম্বর ২০২২ ১০:৪০

কাওয়ালীর সম্রাট নুসরাত ফতেহ আলী খান। ছবি : সংগৃহীত

মাত্র ৮ বছর বয়সে কাওয়ালীর সম্রাট নুসরাত ফতেহ আলী খানের সংগীতের অনুরাগী হয়ে পড়েন আজকের গ্র্যামি পুরস্কার জয়ী গায়িকা আরুজ আফতাব। পেছনে অবদানটা পরিবারেরও অবশ্যই। ছোট্ট আরুজ তখন প্রবাসে, মা-বাবার সাথে থাকতেন সৌদিতে। পারিবারিক গাড়িতে ভ্রমণ যেখানেই হোক– সবচেয়ে বেশি বাজানো হতো নুসরাতের গান।

৩৭ বছর বয়সী ব্রুকলিনের এই সংগীতশিল্পী ইমেইলে আল-জাজিরাকে বলেন 'নুসরাতের কাওয়ালিগুলো আমি কখনোই ভুলতে পারব না। সেগুলো যেভাবে সেই ছোট্ট আমাকে অণুরণিত করত সেগুলোও ভোলা সম্ভব নয়'।

কাওয়ালি অর্থ 'উচ্চারণ', এটি সুফি ভক্তিমূলক সংগীতের একটি রূপ যার মাধ্যমে মূলত আল্লাহ, মুহাম্মদ (স:) ও তার জামাতা ইমাম আলী ইবনে আবি তালিবের প্রশংসা করা হয়।

মূলত উর্দু ও পাঞ্জাবি ভাষায় এবং কখনো কখনো ফারসিতে গাওয়া হলেও এ ধারার সংগীতের সূত্রপাত ১৩ শতকের ভারতবর্ষে।

সুফি রক ব্যান্ড জুনুনের সালমান আহমেদের মতে, 'কাওয়ালির শাহেনশাহ' নুসরাত তার গানের মাধ্যমে শ্রোতাকে এক অপার্থিব প্রশান্তি দানের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার শীর্ষে নিয়ে যেতেন।

৫৮ বছর বয়সী আহমেদ ইসলামাবাদ থেকে আল জাজিরাকে জানান, 'তার কণ্ঠস্বর, অনবদ্য ছন্দ, স্বরকম্পাঙ্ক, আবেগ থেকে আসা টান এসবই হৃদয় ছুঁয়ে যেত'।

আহমেদ আরও জানান নুসরাত আলী খানের স্ট্যামিনা ছিল ব্যাপক এবং গানের মানের সঙ্গে আপস না করেই সারারাত গান গাইতে পারতেন।

মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তার অকালে চলে যাওয়ার পর কেটে গেছে ২৫ বছর। এখনও তিনি দেশ-বিদেশের সংগীতশিল্পীদের অনুপ্রাণিত করে চলেছেন। মাস্ত কালান্দার এবং আলি দা মালং এর মতো গানগুলো উপমহাদেশের শিল্পীরা বহুবার নতুন করে গেয়েছেন।

উঠতি কাওয়ালি তারকা দুই ভাই জেইন ও জোহাইব আলী বলেন, তারা যেখানেই গান গেতে যান না কেন, শ্রোতারা নুসরাত ফতেহ আলী খানের গান শুনতে চান।

'আমাদের দুই-তিনটি গান সম্ভবত মানুষ শুনতে চায়, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা নুসরাত সাহেবের প্রিয় গানগুলো গাওয়ার জন্য আমাদের অনুরোধ করেন'।

সৃজনশীল ও অকুতোভয়
১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে জন্ম নেওয়া নুসরাত ফতেহ আলী খান সুপরিচিত কাওয়ালী গায়কদের এক পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তিনি গজলও গাইতেন।

৬০ -এর দশকের শেষদিকে তিনি পারফর্ম করা শুরু করেন। বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতিস্বরূপ অসংখ্য অ্যাওয়ার্ড ও পুরস্কার পান তিনি। এর মধ্যে আছে ১৯৮৭ সালে প্রেসিডেন্ট অব পাকিস্তানস অ্যাওয়ার্ড ফর প্রাইড অব পারফরম্যান্স যা পাকিস্তানের সংগীতজগতে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে দেওয়া হয়।

জুনুন আহমেদের মতে, 'অন্যান্য কাওয়ালদের থেকে নুসরাত ভিন্ন মূলত সংগীতের বিভিন্ন ধরন নিয়ে তার পরীক্ষামূলক বিভিন্ন কাজের সদিচ্ছার জন্য'।

'নুসরাত ফতেহ আলী খান অত্যন্ত সৃজনশীল ও অকুতোভয় ছিলেন,' বলেন তিনি।

'তিনি যে কারও সঙ্গেই গান করতে পারতেন...সেটা আমি হই বা জেফ বাকলে। তার কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল না,' বলেন আহমেদ। বিশুদ্ধ কাওয়ালদের মতো ছিলেন না তিনি। বরং ঝুঁকি নিয়েছিলেন ভারতসহ বিভিন্ন পশ্চিমা সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে কোলাবোরেশন করে গান গাওয়ার।

খ্যাতনামা ভারতীয় লিরিসিস্ট এবং সংগীত রচয়িতা জাভেদ আখতার এবং গ্র্যামিজয়ী কম্পোজার এআর রহমান দুজনেই পাকিস্তানি এই আইকনের সঙ্গে কাজ করেছেন।

১৯৯৬ সালে আখতারের লেখা গজল আফরিন আফরিন নুসরাতের অন্যতম খানগুলোর মধ্যে একটি। ২০১৭ সালে কোক স্টুডিওতে পুনরায় গানটি গান মোমিনা মুহতেসান এবং নুসরাতের ভাস্তে রাহাত ফতেহ আলী খান। এখন পর্যন্ত ইউটিউবে গানটির ভিউ ৩৭০ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে।

সময়ের ঊর্ধ্বে থাকা এক গায়ক
নুসরাত ফতেহ আলী খানের মৃত্যুর এক মাস বা তার কিছু আগে আহমেদ তার একটি গানের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা জানান। সেখানে নুসরাতকে সুস্থ মনে হচ্ছিল না বলেও স্মরণ করেন তিনি।

'তখন তিনি কিডনি ডায়ালাইসিস করাতেন। আমার মনে আছে আমি আমার স্ত্রীকে বলেছিলাম যে আমার ইচ্ছা তিনি সাময়িকভাবে অবসর নিক। তখন তিনি অনেক বেশি চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন'।

এর কিছুদিন পরেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন নুসরাত ফতেহ আলী খান। চিকিৎসার জন্য লন্ডনের ক্রমওয়েল হাসপাতালেও যান। সেখানেই তার হার্ট অ্যাটাক হয়। ১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

কানাডিয়ান কম্পোজার ব্রুক আল-জাজিরাকে বলেন, 'সংগীত ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকাকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এমন একটি সময় যখন তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করতেন যে দুই সংগীতশিল্পীর মিলিতভাবে সৃষ্ট ফিউশন ভীষণভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছিল।'

তবে আগামী কয়েক দশকেও নুসরাত ফতেহ আলী খানের গান যে অমর হয়ে রবে সে বিষয়ে নিশ্চিত সালমান আহমেদ ও আরুজ আফতাব।

আফতাবের মতে, 'নুসরাত ফতেহ আলী খানের ঘণ্টার পর ঘণ্টা গান গাওয়ার যে দক্ষতা ছিল, তা কেবল চিত্তাকর্ষকই ছিল না, শ্রোতাদের স্বাধীনভাবে গান শোনার আমন্ত্রণও দিত'।

'পশ্চিমে বিটলস এবং লেড জেপলিন যেমন এখনও প্রাসঙ্গিক, তেমনি নুসরাত ফতেহ আলী খানও সচেতন কিংবা অবচেতনভাবে ভারতীয় ও পাকিস্তানি সংগীতশিল্পীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবেন। তার সংগীত সময়ের ঊর্ধ্বে, কখনো পুরোনো হয় না। এগুলো কখনো হারিয়ে যাবে না'।

 



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top