মৃতদেহের ছবি তোলা ছিল যাদের পেশা

রাজ টাইমস | প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৩ ১৯:১৮; আপডেট: ১৯ জুন ২০২৪ ১৮:৫৯

মৃতদেহের ছবি তোলা ছিল যাদের পেশা। ছবি: সংগৃহীত

রবীন্দ্রনের বাবা শ্রীনিবাসনের ফটোগ্রাফি স্টুডিয়ো ছিল। রবীন্দ্রনের বয়স যখন ১৪, তখন বাবা তাকে প্রথমবারের মতো একটা অ্যাসাইনমেন্টে পাঠান।

১৯৭২ সালে নিজের কর্মজীবনের সেই প্রথমদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রবীন্দ্রন বলেন, 'আমার কাজ ছিল একটা মৃতদেহ চেয়ারে সোজা করে বসিয়ে রাখা। তারপর তার চোখের পাতা খুলে ধরা, যাতে ফটোগ্রাফার তার ছবি তুলতে পারেন।'

রিচার্ড কেনেডিও নয় বছর বয়সে এই কাজ শুরু করেন। মরদেহ যে চেয়ারে বসানো হয়েছিল, তার পেছনে সাদা কাপড় ধরে দাঁড়িয়ে থাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাকে।

সেই অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বিবিসিকে বলেন, 'ভয়ে আমি কাঁপছিলাম। সেদিন রাতে একটুও ঘুমাতে পারিনি। বহু রাতে আমার দুঃস্বপ্নে হাজির হতো মৃত মানুষেরা। ভয়ংকর ছিল সেসব অভিজ্ঞতা।'

বাবার ফটো স্টুডিয়ো থাকার সুবাদেই ফটোগ্রাফার হয়েছিলেন রবীন্দ্রন ও কেনেডি। ১ হাজারের বেশি মৃত মানুষের ছবি তুলেছেন তারা।

কয়েক দশক আগেও দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের বহু মানুষ বিশ্বাস করত, জীবিত অবস্থায় ছবি তুললে আয়ু কমে যায়—এজন্য অনেকেরই প্রথম ছবি তোলা হতো তাদের মৃত্যুর পর। সেজন্য একসময় রাজ্যটিতে মৃত মানুষের ছবি তোলার পেশার বেশ রমরমা ছিল। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমন ফটোগ্রাফারের সংখ্যা কমতে কমতে তারা এখন বিলুপ্তির মুখে।

রবীন্দ্রন ও রিচার্ড ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকে তাদের এই ব্যতিক্রমী পেশা নিয়ে কথা বলেছেন বিবিসির সঙ্গে। ওই সময় ভালো আয় হতো এ পেশা থেকে।

রবীন্দ্রন বলেন, কৈশোরে এ কাজটি করতে তার মোটেও ভালো লাগত না। তবে স্কুলে যাওয়াও তার পছন্দ ছিল না, তাই স্কুলে না যাওয়ার অজুহাত হিসেবে এ কাজে যেতেন।

'কয়েক মাস ট্রেনিঙের পর আমি একাই মৃত মানুষের ছবি তুলতে যেতে লাগলাম,' বলেন তিনি।

রবীন্দ্রন ধীরে ধীরে ছবি তোলার জন্য নিজস্ব কিছু কৌশল তৈরি করেন। যেমন, বালিশ দিয়ে মৃতদেহের মাথা উঁচু করা, প্রয়োজনে কাপড় ঠিকঠাক করা এবং ব্যাকগ্রাউন্ড বদলানো।

সময়ের সঙ্গে তিনি ভয়কে জয় করে নিজের কাজকে ভালোবাসতে আরম্ভ করেন।

রিচার্ড কেনেডি তার বাবার সাথে কাজ করতে গিয়েছিলেন তামিলনাড়ুর রাজধানী চেন্নাই থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে ইয়ারকাড পাহাড়ে।

এক মৃত নবজাতক শিশুর ছবি তোলা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর অভিজ্ঞতা।

'[বাচ্চাটার] বাবা-মা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন। মা অবিরল কেঁদে যাচ্ছিলেন।'

তবে রিচার্ড ক্যামেরা নিয়ে যাওয়ার পর ওই মা শিশুটিকে গোসল করিয়ে নতুন গাউন পরিয়ে দেন, কিছু প্রসাধনীও মেখে দেন।

সেই স্মৃতি মনে করে রিচার্ড বলেন, 'বাচ্চাটাকে ঠিক পুতুলের মতো লাগছিল। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বসলেন ওর মা, সেই ছবি তুললাম আমি। দেখে মনে হচ্ছিল, বাচ্চাটা যেন ঘুমাচ্ছে।'

মৃতদেহের গোসল করানো ও ফুল দিয়ে সাজানোর মতো অন্যান্য অনুষ্ঠানের ছবিও তুলতেন তারা। কিছু পরিবার এক-দুটি ছবি পেলেই খুশি হতো, তবে বাকিরা আরও বেশি ছবি চাইত।

'আমি একবার কবরস্থানে গিয়ে মৃতদেহ সমাধিস্থ করার মুহূর্তের ছবিও তুলেছি,' রবীন্দ্রন বলেন।

ছবি তুলে পরিবারের হাতে দেওয়ার জন্য সময় খুব কম পেতেন তারান। মাঝে মাঝে পরিবারগুলো মৃত্যুর একদিন পরেই শোকাচারের জন্য মৃতের ফ্রেমে বাঁধানো ছবি চাইত। তখন তারা রাত জেগে ছবি ডেভেলপ করে প্রিন্ট করতেন।

রবীন্দ্রন ও রিচার্ড কেউই অত আধুনিক ব্যবহার করতেন না। সাদা-কালো ছবি তুলতেন তারা।

তাদের গ্রাহকদের সিংহভাগই ছিল হিন্দু ও খ্রিস্টান। তাদের কেউ কেউ এখনও মৃত আত্মীয়দের ছবি তাদের প্রার্থনাকক্ষে রাখে।

রিচার্ড পুলিশ বিভাগের জন্যও কাজ করতেন। পুলিশ বিভাগের হয়ে তিনি অপরাধ, আত্মহত্যা ও সড়ক দুর্ঘটনাসহ অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ছবি তুলতেন। এসব ঘটনায় মৃতদেহ প্রায়ই বাজেভাবে বিকৃত হয়ে যেত।

কাজটা খুব ভয়-জাগানিয়া ছিল জানিয়ে রিচার্ড বলেন, 'মাঝে মাঝে আমি খেতে পারতাম না, ঘুমাতেও পারতাম না।'

তার তোলা ছবি আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হতো এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দিতে সাহায্য করত।

মৃতদেহের ছবি তোলার জন্য দ্বিগুণ টাকা নিতে পারতেন ফটোগ্রাফাররা। মৃতের আত্মীয়দের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের বকশিসও পেতেন। কিন্তু মৃতদেহের ছবি তোলাটা অনেকেই ভালো চোখে দেখত না।

রিচার্ড বলেন, 'অনেকে আমাকে অন্য কোনো কাজে নিতে চাইত না।'

রবীন্দ্রনের হিন্দু পরিবার মৃত্যুর সাথে যুক্ত জায়গাকে অশুচি মনে করত। তাই বাড়িতে বা স্টুডিয়োতে প্রবেশের আগে তাকে পরিশুদ্ধ হয়ে নিতে হতো।

'আমাকে প্রতিবার স্নান করতে হতো। আমি ক্যামেরা নিয়ে স্টুডিয়োতে ঢোকার আগে আমার বাবা ওটার ওপর খানিকটা পানি ছিটিয়ে দিতেন।'

বহু দেশে মৃত্যুর পর ছবি তোলার প্রথা ছিল। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অনেক শোকার্ত পরিবার তাদের মৃত সন্তান এবং অন্যান্য আত্মীয়দের সঙ্গে ছবি তুলত।

ছবি যখন ব্যয়বহুল ছিল এবং বহু মানুষের নিজের ছবি তোলার সুযোগ ছিল না, সেই সময়ে মৃতদেহের ছবি তোলা পরিবারগুলোর কাছে তাদের প্রিয়জনকে মনে রাখার একটি উপায় ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির ভেতরে বরফের ব্লকের ওপরে মৃতদেহ রেখে ছবি তোলা হতো। মৃত মানুষের ছবি তোলা ভিক্টোরিয়ান ব্রিটেনেও জনপ্রিয় ছিল।

কিন্তু ২০ শতকে বিশ্বের অনেক অঞ্চল থেকে এই প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর কারণ সম্ভবত স্বাস্থ্যসেবায় উন্নতি হওয়ার কারণে প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়ে যায়। তবে তামিলনাড়ুসহ ভারতের অন্যান্য রাজ্য, যেমন পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যায় ও পবিত্র শহর বারাণসীতে এ প্রথা দীর্ঘদিন প্রচলিত ছিল।

রিচার্ড জানান, 'ফটোগ্রাফির আবির্ভাবের আগে বড় জমিদাররা শিল্পীদের টাকা দিয়ে নিজের প্রতিকৃতি আঁকিয়ে নিতেন।

'স্মৃতি সংরক্ষণের এই উদ্দেশ্যেরই আরেক রূপ ছিল ফটোগ্রাফি। শিল্পীদের দিয়ে প্রতিকৃতি আঁকানোর সামর্থ্য ছিল শুধু ধনীদেরই। কিন্তু দরিদ্র লোকেরাও ছবি তোলার টাকা জোগাড় করতে পারত।'

কিন্তু ১৯৮০-র দশকের শেষের দিকে সস্তা, সহজে ব্যবহারযোগ্য ক্যামেরায় বাজার সয়লাব হয়ে যায়। এরপরই জীবিত অবস্থায় ছবি তুললে আয়ু কমে যাবে, এই কুসংস্কার উঠে যায় মানুষের মন থেকে।

তারপর মৃতদেহের ছবি তোলার চাহিদা কমে যায়। রিচার্ড তখন ধীরে ধীরে গির্জার অনুষ্ঠান ও উৎসবের ছবি তুলতে শুরু করেন।

আর রবীন্দ্রন স্কুলের অনুষ্ঠান ও সরকারি কর্মসূচির ছবি তুলতে আরম্ভ করেন। শেষে তিনি বিয়ের অনুষ্ঠানের ফটোগ্রাফার হয়ে ওঠেন।

ষাট পেরিয়েছে রবীন্দ্রনের বয়স। মৃতরা তাকে ব্যবসা শিখিয়েছে, সাহায্য করেছে মৃত্যুভয় কাটিয়ে উঠতে—সেজন্য তিনি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলে দিলেন, 'আমি চাই না আমার মৃত্যুর পর কেউ আমার ছবি তুলুক।'

অন্যদিকে ৫৪ বছর বয়সি রিচার্ড এখনও পরিবারের সদস্যসহ মৃতদের ছবির বড় সংগ্রহ রেখে দিয়েছেন নিজের কাছে।

তিনি বলেন, 'আমাদের পরিবার সবসময় পূর্বপুরুষদের ছবি সংরক্ষণ করে। আমার ছোট ছেলেকে বলেছি, আমার মৃত্যুর পর ও যেন আমার ছবি তোলে।'

সূত্র: বিবিসি বাংলা



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top