রিলিফ ওয়ার্ক

রাজ টাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১১:৫৮; আপডেট: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১২:০৬

গতকাল ৩ সেপ্টেম্বর ছিল আবুল মনসুর আহমেদের ১২২তম জন্মবার্ষিকী। আবুল মনসুর আহমেদের মূল পরিচয় একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে। আইনজ্ঞ ও সাংবাদিক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল। কিন্তু একই সাথে তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন শক্তিমান লেখক। বিশেষ করে তৎকালীন সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নিতী ও রাজনৈতিক দুরবস্থা নিয়ে রচিত বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক রচনায় তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর এই ধরনের রচনার মধ্যে আয়না, ফুড কনফারেন্স ও গালিভারের সফরনামা অন্যতম। ‘রিলিফ ওয়ার্ক’ গল্পটি তাঁর লেখা ফুড কনফারেন্স বই হতে নেয়া। এ গল্পের মূল প্রতিপাদ্য ছিল বন্যায় ত্রাণ বিতরণের অনিয়ম। আশ্চর্যের বিষয়, গল্পটি যদিও ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয় তবুও বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথে প্রাসঙ্গিক। এখানে পড়ুন সেই গল্পের একটি অংশ...

প্রায় অর্ধেক লোককে সাহায্য দেওয়া হইয়াছে, এমন সময় তাম্বুর সামনে একখানা নৌকা ভিড়িল।

দুইজন ভদ্রলোক নৌকা হইতে নামিলেন। কেন্দ্রকর্তা ‘আসুন চক্রবর্তী’ মশাই, ‘আসুন চৌধুরী সাহেব’ বলিয়া তাহাদিগকে অভ্যর্থনা করিয়া হামিদের নিকট আনিলেন এবং লোহার চেয়ারে বসিতে বলিলেন।

তারপর তিনি হামিদের দিকে চাহিয়া বলিলেন: ইন্স্পেক্টর সাব, এরা দুইজন রঘুনাথপুরের শ্রীযুক্ত যতীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও শমশের আলী চৌধুরী।

আহা! বন্যায় ভদ্রলোকদের যা অবস্থা হইয়াছে, তা আর বলিবার নয়। গোলার ধান চাল সব বন্যায় ভাসাইয়া নিয়াছে। কই হে শরৎ, বাবুদের চাল-ডালটা নৌকায় পৌঁছাইয়া দাও ত।

যতীন বাবু ও চৌধুরী সাহেব ব্যস্ত হইয়া বলিলেন: না, না, এরা দিয়া আসিবে কেন, আমাদের সঙ্গেই লোক আছে। কইরে রামটহল, ইনাতুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে এখানে আয় ত।

চৌকিদারী ইউনিফর্ম পরা লোক নৌকা হইতে ছালা ও ডালি লইয়া নামিয়া আসিল।

এতক্ষণ সমবেত কৃষকগণের মধ্যে যাহারা চাউল বিতরণ করিতে ছিল, তাহারা সকলেই বিতরণ-কার্য অর্ধ সমাপ্ত রাখিয়া ত্রস্তব্যস্ত চাউল-ডাউল মাপিয়া দুই বস্তা চাউল, এক ডালি ডাউল, এক ডালি লবণ মরিচাদি দিয়া দুইজনকে বিদায় করিল।
ভদ্রলোকদ্বয় উঠিয়া সকলকে ধন্যবাদ দিয়া হামিদকে নমস্কার ও আদাব দিয়া নৌকায় উঠিলেন।

কেন্দ্রকর্তা বন্যায় উহাদের ক্ষতির পরিমাণ সবিস্তারে হামিদের নিকট বর্ণনা করিতেছিলেন।

সেদিকে হামিদের কান ছিল না। সে স্তম্ভিতের মতো বসিয়া সম্মুখস্থ অর্ধনগ্ন নরকঙ্কালগুলির দিকে চাহিয়া ছিল। তার অজ্ঞাতেই বোধ হয় তার চক্ষে অশ্রু ঠেলিয়া উঠিতেছিল।

অতিকষ্টে প্রকৃতিস্থ হইয়া হামিদ কঠোর ভাষায় কেন্দ্রকর্তাকে জিজ্ঞাসা করিল: এঁদের দুইজনকে কতজনের খোরাক দিলেন?
কেন্দ্রকর্তা উৎসাহভরে বলিলেন: এঁদের বিরাট ফ্যামিলি। এতক্ষণ তবে আর বলিলাম কি আপনার কাছে? জোত-জমি বাড়িতে দালান কোঠা...

বাধা দিয়া হামিদ বলিল: কই ইহাদের ত টিকিট চেক করিলেন না?

কেন্দ্রকর্তা বিস্মিত হইয়া বলিলেন: বলেন কি? ইহাদের মতো লোক কি আর ফাঁকি দিয়া অতিরিক্ত চাউল লইতে পারে?

হামিদ রাগ সামলাইতে পারিল না। ঈষৎ ব্যঙ্গস্বরে বলিল: এই সমস্ত অভুক্ত কৃষক কি তবে ফাঁকি দিয়া অতিরিক্ত চাউল নেয়?

কেন্দ্রকর্তা অভিক্ষের মাতব্বরির স্বরে হাসিয়া বলিলেন: ‘আপনি রাখেন না এদের বদমায়েশির খবর। ইহারা—’
হঠাৎ গোলমালে তাহদের কথোপকথনে বাধা পড়িল।

একটা বুড়ো লোক ও মধ্যবয়সী স্ত্রীলোককে কর্মীরা ধরিয়া টানাটানি করিয়া তাহাদের দিকে আনিবার চেষ্টা করিতেছিল। স্ত্রীলোকটার কাপড় ধরিয়া তিন চারটা ন্যাংটা ছেলে-মেয়ে পিছন হইতে তাহাকে টানিতে ছিল এবং চিৎকার করিয়া কাঁদিতেছিল।

ব্যাপার কি দেখিবার জন্য হামিদ আসন হইতে উঠিতেই কেন্দ্রকর্তা তার জামার কোণ ধরিয়া বলিলেন: আপনি বসুন না, এখানেই ওদের লইয়া আসিবে।

হামিদ সবলে জামা ছাড়াইয়া লইয়া অগ্রসর হইল। হামিদ গিয়া দেখিল বুড়াটাকে কর্মীরা দু-এক ঘা চড়-চাপড় মারিতেছে এবং মেয়েলোকটার গলায় কাপড় লাগাইয়া টানাটানি করিতেছে।

হামিদ কাছে যাইতেই উহারা হাউমাউ করিয়া কি বলিতে চাহিল। কর্মীরা ধমক দিয়া বলিল: বেশি গোলমাল করবি তো পুলিশে দিব।

পুলিশের নাম শুনিয়া অপরাধীদ্বয় চুপ করিল। হামিদ সকলকে শান্ত হইতে বলিয়া গোলমালের কারণ জিজ্ঞাসা করিল।

নগেন্দ্র নামক কর্মীটি তাহার দিকে অগ্রসর হইয়া বলিল: মি. ইনস্পেক্টর, ইহারা অতিশয় বদমায়েশ লোক। ইহারা টিকিটের পেন্সিলের দাগ মুছিয়া ফেলিয়া দুইবার চাউল লইয়াছে।

হামিদ কঠোর দৃষ্টিতে অপরাধীদ্বয়কে বলিল, এ কথা সত্যি?

উহারা মাথা হেঁট করিয়া রহিল। কোনো উত্তর দিল না। হামিদের বিষম রাগ হইল। কঠোরতর স্বরে চিৎকার করিয়া বলিল: কেন এমন অন্যায় কাজ করিলে উত্তর দাও।

জওয়াবে হতভাগ্য ও হতভাগিনী ভয়ে কাঁপিতে-কাঁপিতে যা বলিল, তার সারমর্ম এই যে, তাদের এত পোষ্য এবং তাদের এত ক্ষুধা যে, যে চাউল তাদের দেওয়া হয়, তাদের পেটের এক কোনাও ভরে না। তাই নিতান্ত নিরুপায় হইয়া তাহারা এই ফন্দি বাহির করিয়াছে।

কেন্দ্রকর্তা বিজয় গৌরবে হামিদের দিকে চাহিয়া হাসিলেন এবং অপরাধীদের দিকে চাহিয়া মেঘ গর্জনে আদেশ করিলেন: এই অপরাধের শাস্তিস্বরূপ আগামী দুই দিন তোমাদিগকে কোনো সাহায্য দেওয়া হইবে না।

নগেন্দ্র অপরাধীদ্বয়ের টিকিটে কাল দুইটি করিয়া দাগ দিয়া তাহাদের টিকিট ফিরাইয়া দিল।

দণ্ডিত হতভাগ্যদ্বয় মাথা নিচু করিয়া কম্পিত পদে চলিয়া গেল। অন্যান্য সাহায্যপ্রার্থীরাও তাহাদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া সমস্বরে অনেক টিট্কারী দিল। কেহ-কেহ আশ্রাব্য গালি-গালাজও দিল।

আবু সুফিয়ান



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top