কারার ঐ লৌহকপাট: প্রেক্ষাপট ও বিকৃতি

রাজ টাইমস | প্রকাশিত: ১৯ নভেম্বর ২০২৩ ২০:০২; আপডেট: ২৩ মে ২০২৪ ০৯:৫৯

‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ উদ্দীপনামূলক এই গানটি বাঙালি কবি, বাংলাভাষার কবি, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ও সুরারোপিত। ১৯২২ সালে ‘বাঙ্গলার কথা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় গানটির বাণী মুদ্রিত হয়। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও সহকারী সম্পাদক হেমন্ত কুমার সরকার। ১৯২১ সালের ১০ ডিসেম্বর চিত্তরঞ্জনকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হলে তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী পত্রিকা সম্পাদনার ভার নেন। তিনি এই সময়ে ‘বাঙ্গলার কথা’য় ছাপাবার জন্য কাজী নজরুল ইসলামকে একটি কবিতা দিতে অনুরোধ করতে দাশ পরিবারের সুকুমার রঞ্জন দাশকে পাঠান। স্মৃতিকথায় মুজফ্ফর আহমদ জানিয়েছেন যে, সুকুমার রঞ্জন দাশ নজরুলের সঙ্গে কোথায় দেখা করেছিলেন তালতলা না কলেজ স্ট্রিটে সেটা আর তাঁর মনে নেই। তবে সে সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন। সুকুমার রঞ্জন আর তিনি বসে আস্তে আস্তে গল্প করছেন, আর কাছেই বসে নজরুল অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে কবিতা লিখে চলছেন। কবিতার শিরোনাম হলো ‘ভাঙার গান’। অনেকে মনে করেন ‘ভাঙার গান’ হুগলি জেলে লেখা হয়েছিল—এটা ঠিক নয়। তবে জেলখানায় গানটি গাওয়ার সময় বন্দীরা ভীষণ খেপে গিয়েছিল। কারণ ‘যত সব বন্দীশালায় আগুন জ্বালা’ বলায় বন্দীরা ভেবেছিল তাদের ‘শালা’ বলে গালি দেওয়া হয়েছে। অবশ্য ভুল ভাঙতে দেরি হয়নি।

‘ভাঙার গান’ শিরোনামের এ গানটি ২০ জানুয়ারি, ১৯২২ সালে ‘বাঙ্গলার কথা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গানটি পরবর্তী সময়ে গিরীন চক্রবর্তীর সংগীতায়োজন ও কণ্ঠে দুটি কোম্পানি থেকে রেকর্ড হয়। প্রথমটি জুন ১৯৪৯ সালে কলম্বিয়া থেকে, রেকর্ড নম্বর-জিই৭৫০৬ এবং দ্বিতীয়টি জানুয়ারি ১৯৫০ সালে এইচএমভি থেকে, রেকর্ড নম্বর-এন ৩১১৫২।

এইচএমভি-র রেকর্ডকৃত গানটি ১৯৫০ সালে ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ এবং ১৯৬৯-৭০ সালে কালজয়ী চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় ব্যবহূত হয়। গানটি নজরুলের ‘ভাঙার গান’ কাব্যে অন্তর্ভুক্ত। দেখা যাচ্ছে, ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানটি কবি লিখেছেন ১৯২১ সালের শেষে, পরের বছরের শুরুতেই ১৯২২ সালে তা পত্রিকায় ছাপা হয় কবিতা হিসেবে। এরপর কোনো একসময় নজরুল এতে সুর দেন এবং তাঁর জেলজীবনে (২৩.১১.১৯২২—১৫.১২.২০২৩) বিভিন্ন কয়েদির সঙ্গে কণ্ঠ দেন। কিন্তু এ সুরটির কোনো রেকর্ড পাওয়া যায় না। ১৯৪২ সালে অসুস্থ হওয়ার পরে গানটি আরো আড়ালে চলে যায়। গিরীন চক্রবর্তীর গাওয়া গানটিই বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত। আর এই প্রতিষ্ঠিত সুরের বিকৃতিই সারা বিশ্বের নজরুল ভক্তদের কষ্ট দিয়েছে।

সম্প্রতি বলিউডের পরিচালক রাজা কৃষ্ণ মেননের ‘পিপ্পা’ সিনেমায় অস্কারজয়ী সুরকার ও সংগীত পরিচালক এ আর রহমান কাজী নজরুল ইসলামের জাগরণীমূলক ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ গানটির সুর বিকৃত করে উপস্থাপন করেছেন। মূল গানটি ছিল দ্রুত দাদরায় রিদমিক আর রহমানকৃত সুরটি বিয়ের গীতের মতো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আলোচিত ‘গরিবপুর যুদ্ধ’ নিয়ে ‘পিপ্পা’ সিনেমার গল্প। যশোরের কপোতাক্ষের তীরে সেক্টর কমান্ডার জেনারেল মঞ্জুরের অধিনায়কত্বে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে ভারতীয় বাহিনীর ক্যাপ্টেন বি এম মেহতা উপ-অধিনায়ক ছিলেন। যুদ্ধটি হয়েছিল নভেম্বর ১৯৭১-এ। ঠিক এ কারণেই ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ গানটি পরিচালক বেছে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অবলম্বনে সিনেমা, অথচ সে দেশের জাতীয় কবির উদ্দীপনামূলক গান থাকবে না—তা কি হয়!

অবাঙালি এ আর রহমান না-হয় নজরুলের গানের প্রতিষ্ঠিত সুরকে গুরুত্ব দেননি, কিন্তু যাঁরা গেয়েছেন—তীর্থ চট্টোপাধ্যায়-এর সঙ্গে রাহুল দত্ত, পীযূষ দাশ, শালিনী মুখোপাধ্যায়, দিলাশা চৌধুরী, শ্রয়ী পালসহ একাধিক বাঙালি শিল্পী এই দলে ছিলেন। তাঁদের কাছে সুরের এই বিচ্যুতি চোখে পড়ল না?

বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত এসংক্রান্ত খবর থেকে জানা যায়, ২০২১ সালে নজরুলের ছোট ছেলে কাজী অনিরুদ্ধের ছেলে কাজী অনির্বাণ ও তাঁর মা কল্যাণী কাজী ‘পিপ্পা’ সিনেমা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গানটি ব্যবহারের লিখিত চুক্তি করেন। চুক্তিনামায় প্রথম সাক্ষী ছিলেন অনির্বাণ কাজী। তবে এ ঘটনা কবি পরিবারের অন্য সদস্যবৃন্দ, বিশেষ করে বাংলাদেশে বসবাস করা সদস্যদের জানানো হয়নি।

কাজী অনির্বাণ স্বীকার করেন—মা গানটা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন সুর এবং কথা না বদলে রিক্রিয়েট করার জন্য। কিন্তু সেই সময় ওদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, গানটা ওরা নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে চায়। মা ওদের বলেছিল, গানটা তৈরি হয়ে গেলে একবার শোনাতে। কিন্তু ওরা কিছুই শোনাননি।

এখন, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ গানটির সুর বিকৃতির জন্য আমরা কাকে দায়ী করব?

 



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top