এলপিজিতে সরকারি বিনিয়োগকে অযৌক্তিক বলছে বেসরকারি অপারেটররা

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ২১ নভেম্বর ২০২২ ০৯:৪৫; আপডেট: ৯ ডিসেম্বর ২০২২ ০৯:১৭

ছবি: সংগৃহিত

দেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসে (এলপিজি) বিনিয়োগ বেশী বেসরকারি উদ্যোক্তাদের। ফলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক লাখ টন উৎপাদনক্ষমতার এলপিজি স্টোরেজ ও বটলিং প্লান্ট নির্মাণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক হিসেবে দেখছেন বেসরকারি অপারেটররা। খবর বণিক বার্তার।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক লাখ টন উৎপাদনক্ষমতার এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) স্টোরেজ ও বটলিং প্লান্ট নির্মাণ করবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।এরই মধ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উপজেলার বোয়ালিয়া মৌজায় প্রায় ১৩ একর (১২.৮৮) জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। দেশের বাজারে এলপিজির বার্ষিক যে চাহিদা তার চেয়ে প্রায় তিন গুণ সরবরাহ সক্ষমতা রয়েছে বেসরকারি এলপিজি অপারেটরদের। ঠিক এ সময়ে এলপিজি নিয়ে সরকারি সংস্থাটির এ ধরনের পরিকল্পনা অযৌক্তিক বলে দাবি করেছেন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা।

তারা বলছেন, দেশের বাজারে এলপি গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ১২ লাখ টন, যার পুরোটাই সরবরাহ করছে বেসরকারি অপারেটররা। সরবরাহ সক্ষমতা আছে বলেই বড় কোম্পানিগুলো এ খাতে আরো বিনিয়োগ করেছে। যেখান থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্বও পাচ্ছে সরকার। এ অবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো কোম্পানি এ খাতে বিনিয়োগ করলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ হুমকিতে পড়বে।

জ্বালানি বিভাগের অক্টোবরের এক বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা গিয়েছে, সীতাকুণ্ডের বোয়ালিয়া মৌজায় বিপিসি এলপিজি স্টোরেজ ও বটলিং প্লান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বন বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কাগজপত্রের জটিলতা চুকিয়ে এ প্রকল্পের ভূমির বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। সেখান থেকে অনুমোদন মিললে এ প্রকল্পের সরেজমিন কার্যক্রম শুরু করবে বিপিসি।

সীতাকুণ্ডে পরিকল্পনাধীন এ এলপিজি স্টোরেজ ও বটলিং প্লান্টে পুরো অর্থায়ন করবে বিপিসি। এটি বাস্তবায়ন করবে সংস্থাটির সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড (এলপিজিএল)। প্রায় ৪০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পে প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য গ্রাহকের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করা।

এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবু হানিফ বণিক বার্তাকে বলেন, এলপি গ্যাসের বিদ্যমান বাজার বিবেচনায় নিয়ে বিপিসি এ ধরনের প্রকল্প পরিকল্পনা করেছে। এ ধরনের প্রকল্প নেয়া হয়েছে মূলত গ্রাহকের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস পৌঁছে দেয়ার জন্য। এটি নির্মাণ করা গেলে এলপি গ্যাস খাতের বাজার সাশ্রয়ী হতে বড় ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে সরকারি এলপিজিএল কোম্পানি আরো বৃহৎ পরিসরে গ্রাহকের কাছে পণ্যটি পৌঁছাতে পারবে।

বর্তমানে সরকারি কোম্পানি এলপিজিএল বাজারে সাড়ে ১২ কেজির এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করছে ৫৯১ টাকায় (বিইআরসি নির্ধারিত)। বছরে সাড়ে ১২ হাজার টন এলপিজি সরবরাহের পুরোটাই আসছে স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে। যে কারণে এর মূল্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা এলপি গ্যাসের তুলনায় অর্ধেকের বেশি সাশ্রয়ী। অন্যদিকে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সরবরাহকৃত এলপি গ্যাসের মূল্য এখন ১ হাজার ২৫১ টাকা (নভেম্বরের জন্য)। সৌদি আরামকো কোম্পানি সিপি অনুযায়ী কমিশন নির্ধারিত দামে বাজারে এলপি গ্যাস সরবরাহ করছে বেসরকারি অপারেটররা।

বিপিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাইরে থেকে এলপিজির কাঁচামাল আমদানি করে তা বটলিং করে জ্বালানি তেল বিপণনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত তিন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, যমুনা অয়েল ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে বাজারজাত করবে। বিপিসির আমদানি করা এলপি গ্যাস বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের প্রাইসিং ফর্মুলা অনুযায়ী নির্ধারিত বাজারে বিক্রি হবে।

বিপিসির এ ধরনের পরিকল্পনা হঠকারী বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টদের অনেকেই। তারা জানান, এর আগে বিপিসি আরো বেশ কয়েকটি বড় পরিকল্পনা নিয়েছে, যেগুলোর এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক কোনো অগ্রগতি নেই। বছরে ৩০ লাখ টন জ্বালানি তেল পরিশোধনক্ষমতার ইস্টার্ন রিফাইনারি বা ইআরএল-২ ইউনিট নির্মাণ পরিকল্পনা করেছিল সরকার। ২০১০ সালে নেয়া এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ছিল বিপিসির। গত ১২ বছরেও এ প্রকল্পের সন্তোষজনক কোনো অগ্রগতি হয়নি। এছাড়া মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের দায়িত্ব বিপিসির হাতে। আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরে শুরু হলেও এ প্রকল্পের মাঠপর্যায়ে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। এ প্রকল্প আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর প্রকল্প গ্রহণ হয় মূলত জনগণ ও ভোক্তার স্বার্থে। তবে প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এখন অন্যতম উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে। সরকারি কোনো কোম্পানি ভোক্তার স্বার্থে যদি এলপিজি সরবরাহ নিয়ে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে এবং সেটি ভোক্তার স্বার্থে হয়, তাহলে সেটিকে আমরা সাধুবাদ জানাই। সরকারি এলপিজি দামে সাশ্রয়ী হয়, সেটি যাতে বস্তিবাসী, ফুটপাতের বাসিন্দা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী পায়। এ বিষয়ে আমরা সোচ্চার হচ্ছি বারবার।


বিপিসির এ ধরনের উদ্যোগ এলপিজি খাতে অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলবে বলে জানিয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, এমনিতেই তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে ছোট কোম্পানিগুলো। তার ওপর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের প্রাইসিং ফর্মুলায় এ খাতের ব্যবসা সংকুচিত হয়ে আসছে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারি কোম্পানিটির এ ধরনের কার্যক্রম গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে জানান তারা।

বেসরকারি এলপিজি কোম্পানিগুলোর সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সভাপতি আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে এলপিজি কোম্পানিগুলো তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অনেক কোম্পানি প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে। এমন যখন অবস্থা, তখন রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো প্রতিষ্ঠান এ খাতে ব্যবসা করতে চাইলে তাদের স্বাগত জানাই। তবে বাজার বিশ্লেষণ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যতে এ বাজার কোন দিকে যাবে, সে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা উচিত।

স্থানীয় বাজারে এলপিজির চাহিদার প্রায় পুরোটা সরবরাহ করছে বেসরকারি এলপিজি অপারেটররা। ছোট বাজারে দুই ডজনেরও বেশিসংখ্যক কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করায় এরই মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বেশ কয়েকটি কোম্পানি এ খাত থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।


এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবের তথ্য (জুন ২০২১) অনুযায়ী, বেসরকারি এলপিজি খাতের বাজার এখন ৩০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। ২৭টি প্রতিষ্ঠান এ খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে। এসব অপারেটরের বর্তমান এলপিজি মজুদ সক্ষমতা এক লাখ টন। গত পাঁচ বছরে এলপি গ্যাস জনপ্রিয় ও চাহিদা বাড়ায় এ খাতে বার্ষিক চাহিদা এখন প্রায় ১২ লাখ টন। ৯৮ শতাংশ এলপি গ্যাস সরবরাহ করছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। বাকি ২ শতাংশ সরকারি এলপি গ্যাস কোম্পানি সরবরাহ করছে।

দেশের বাজারে এলপি গ্যাস সরবরাহে শীর্ষস্থান দখলে বসুন্ধরা এলপি গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের। কোম্পানিটির মার্কেট শেয়ার বর্তমানে ২০ শতাংশ।

স্থানীয় বাজারে সরকারি কোম্পানির এলপি গ্যাস খাতে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনাকে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন ওরিয়ন এলপি গ্যাসের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) প্রকৌশলী অনুপ কুমার সেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, স্থানীয়ভাবে এলপি গ্যাসের যে চাহিদা তার প্রায় তিন গুণ সক্ষমতা রয়েছে বেসরকারি অপারেটরদের। বিপিসি যদি আমদানি করে এলপি গ্যাস বিক্রি করে, সেক্ষেত্রে বেসরকারি অপারেটরদের চেয়ে কম মূল্যে সরবরাহ করা চ্যালেঞ্জিং। যদি সরকার ভর্তুকি দেয় সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসি চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। পর্যায়ক্রমে সেটি বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।

বণিক বার্তার প্রতিবেদনটির লিঙ্ক

 



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top