৩৬ জুলাই : রাজশাহীতে গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত অধ্যায়
রণক্ষেত্রে পরিণত রাজশাহী ॥ শতাধিক আহত
শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন | প্রকাশিত: ৫ আগস্ট ২০২৬ ১৩:৩১; আপডেট: ৫ আগস্ট ২০২৬ ১৪:৫৯
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের শেষ দুই দিন ৪ ও ৫ আগস্ট রাজশাহীর ইতিহাসে রক্তাক্ত ও স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে। একদফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে অসহযোগ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় এই দুই দিনে রাজশাহী কার্যত আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। নগরজুড়ে মিছিল, ব্যারিকেড, সড়ক অবরোধ ও গণসমাবেশের মধ্যেই পুলিশ এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। বিশেষ করে ৫ আগস্ট আলুপট্টি মোড়, সাহেববাজার, জিরোপয়েন্ট, রেলগেট, লক্ষ্মীপুর, কোর্ট এলাকা ও নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষে সাকিব আনজুম ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং মাথায় গুলিবিদ্ধ আলী রায়হান চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ৮ আগস্ট হাসপাতালে মারা যান। আহত হন শতাধিক মানুষ।
৪ আগস্ট উত্তপ্ত রাজশাহীঃ এদিন সকাল থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে রাজশাহীতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী কলেজ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্র-জনতা মিছিল নিয়ে সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে সমবেত হয়। নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে ব্যারিকেড দেওয়া হয় এবং যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। দিনভর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। বিকেলের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার সামনে অবস্থান নেন এবং একদফা দাবিতে স্লোগানে মুখরিত হয় পুরো নগরী। জাতীয়ভাবে সেদিন সহিংসতায় বহু প্রাণহানির খবর রাজশাহীর আন্দোলনকারীদের আরও বিক্ষুব্ধ করে তোলে। একই সাথে রাজশাহী মহানগরী এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয় সশস্ত্র বাহিনী ও আওয়ামীলীগ-ছাত্রলীহসহ দলীয় ক্যাডার বাহনী। বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে ককটেল বিস্ফোরণ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। পুরো শহরে এক ধরনের থমথমে ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করলেও সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা দমে না গিয়ে রাজপথ দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
৫ আগস্ট রক্তাক্ত বিজয়ের দিন ঃ ৫ আগস্ট সকাল থেকেই রাজশাহীতে ছাত্র-জনতার ঢল নামে। "লং মার্চ টু ঢাকা" কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে হাজারো মানুষ নগরীর বিভিন্ন সড়কে নেমে আসেন। আলুপট্টি মোড়, সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট, রেলগেট ও লক্ষ্মীপুর এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ চরম আকার ধারণ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সংঘর্ষের একপর্যায়ে গুলিবর্ষণ শুরু হলে আন্দোলনকারীরা চারদিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। এ সময় রানীনগর এলাকার বাসিন্দা সাকিব আনজুম (২৭) গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তাঁর মরদেহ দীর্ঘ সময় ঘটনাস্থলেই পড়ে ছিল। তিনি রানীনগর এলাকার মইনুল হকের পুত্র। একই ঘটনায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন আলী রায়হান (২৮)। তাঁকে গুরুতর অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৮ আগস্ট তিনি মারা যান। পরবর্তী সময়ে তাঁকে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এদিন কমপক্ষে ৩৫ জন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল বলে হাসপাতাল সূত্র জানায়। এদিকে সংঘর্ষ চলাকালে আলুপট্টি, সাহেববাজার ও আশপাশের এলাকায় কয়েকজন আন্দোলনকারীকে ধরে মারধরের অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটক করে পিটিয়ে আহত করেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। এছাড়া ৪ আগস্ট আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেওয়াকে কেন্দ্র করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহীর সমন্বয়ক রাকিব হাসান অর্ণবকে ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের একাংশ মারধর করেন।
অস্ত্র হাতে যুবলীগ নেতা রুবেল ঃ ৫ আগস্ট রাজশাহীর আলুপট্টি ও বোয়ালিয়া এলাকায় সংঘর্ষের সময় যুবলীগ নেতা জহিরুল ইসলাম রুবেলকে দুই হাতে দুটি পিস্তল নিয়ে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার দিকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। সরকার পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকা থেকে রুবেলকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনের একাধিক মামলা রয়েছে।
সরকার পতনের খবর ঃ
এদিন দুপুরের পর ফ্যাসিষ্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও মহানগরীর সাহেববাজারসহ বিভিন্ন প্রধান সড়কে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ নেমে এসে বিজয় মিছিল ও উল্লাস প্রকাশ করেন। রাজশাহীর রাজপথে আনন্দ-উল্লাস শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা বিজয় মিছিল বের করেন। একই সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটে। প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে এবং সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামে।
রাজশাহীর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য
রাজশাহীতে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের শুরু থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী কলেজ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ৪ ও ৫ আগস্টের সংঘর্ষ সেই আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে বিবেচিত হয়। সাকিব আনজুম ও আলী রায়হানের মৃত্যু রাজশাহীর আন্দোলনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে আছে এবং তাঁদের স্মরণে পরবর্তীতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজশাহীর সংঘর্ষে আহতের মোট সংখ্যা ৮০ থেকে ১২১ জন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে সব আহতের পূর্ণাঙ্গ সরকারি নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
হুকুমদাতা সাবেক মেয়র লিটন ও ডাবলু সরকার
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার হুকুমদাতা ও নেতৃত্বদানকারী হিসেবে সাবেক মেয়র লিটন ও ডাবলু সরকার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। তবে সরকার পরিবর্তনের পর ডাব্লিউ সরকারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আর ৫ আগস্ট পরিবার নিয়ে পালিয়ে যান সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। রাসিকের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের বিরুদ্ধে হত্যা, হামলার একাধিক মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। এসব মামলায় তাদের নাম প্রধান আসামিদের তালিকায় রয়েছে। এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। অপর দিকে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতা ও হত্যার ঘটনায় সাবেক মেয়র লিটন ও ডাবলুসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। এসব মামলায় সুনির্দিষ্টভাবে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ আনা হয়। এ অভিযোগের অন্য আসামিরা হলেন সাবেক এমপি মো. আসাদুজ্জামান আসাদ, আরএমপি কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদার, ওসি হুমায়ুন কবির, রকি কুমার ঘোষ, রাশিক দত্ত, জহিরুল ইসলাম রুবেল, বাপ্পী চৌধুরী রনি, মহিদুল ইসলাম মোস্তফা, খালিদ হাসান বিপ্লব, রাশেদুল করিম রোজেল, মেহেদী হাসান ওরফে রনি, জেডু সরকার ওরফে জাবেদুর রহমান, আব্দুল হামিদ সরকার ওরফে টেকন, আনোয়ার হোসেন ওরফে আনার, আরমান আলী, আব্দুল মোমিন, শাহাদত হোসেন শাহু, তৌহিদুল হক সুমন, মাহতাব হোসেন চৌধুরী, আলাউদ্দিন ওরফে আলাল, সরিফুল ইসলাম বাবু, মো. নাবিল হাসান, মাহমুদুল হাসান রাজীব, ফরহাদ হোসেন বিপ্লব, তৌরিদ আল মাসুদ রনি, মেহেদী হাসান রিমেল ওরফে রিগেন, আশরাফুল ইসলাম জাফর, সুকান্ত কুমার দাস, ফয়সাল আহমেদ রুনু, নুর মোহাম্মদ সিয়াম, আসাদুল্লা-হিল-গালিব, গোলাম কিবরিয়া, আলাল পারভেজ লুলু, মনিরুজ্জামান খান ওরফে মনির, শফিকুজ্জামান ওরফে শফিক ও মোহাইমিনুল ইসলাম মানিক।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে রাজশাহী মহানগরের বোয়ালিয়া থানার শেখেরচক স্বচ্ছ টাওয়ারের বিপরীতে লবঙ্গ রেস্টুরেন্টের সামনে আন্দোলনকারী রায়হান আলীকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। একই সময় শাহ মখদুম কলেজের সামনে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন আনজুম সাকিব। এছাড়া পদ্মা নদীর বেড়িবাঁধ, আলুপট্টি মোড় ও আশপাশের এলাকায় সহিংসতার ঘটনায় সালমান ওরফে শিমুলসহ আরও ৪৫ জন গুরুতর আহত হন।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: