চামড়া খাতের বিপর্যয়ের মূলে সাভার ট্যানারি শিল্পনগরী

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৬ জুলাই ২০২১ ০৯:০৭; আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১১:০৬

ছবি: সংগৃহিত

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণ হয়নি। এতে প্রতি ঘন ফুট চামড়ার আর্ন্তজাতিক মূল্য যেখানে দুই মার্কিন ডলার, সেখানে বিক্রি করতে হচ্ছে অর্ধেক দামে অর্থাৎ এক ডলার করে। এভাবে রফতানিতে মার খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। চামড়ার বর্জ্য শোধনাগারের জন্য সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের (সিইটিপি) কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। আর ট্যানারির কঠিন বর্জ্য পরিশোধনের কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। এভাবে গত ১৯ বছরের প্রকল্প অসম্পূর্ণ রেখেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ব্যয় ছয় গুণ বেড়ে ১৭৫ কোটি টাকা থেকে এ হাজার ১৫ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।


কথাগুলো বলছিলেন সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর একজন উদ্যোক্তা। তিনি জানান, প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। দুই বছরের কাজ ১২ বার সময় বাড়িয়ে ১৯ বছর পার করা হয়েছে; কিন্তু ট্যানারি শিল্পনগরী গড়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি।


ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি মো: শাহীন আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। এখনো অনেক কাজ বাকি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বর্জ্য শোধনাগারসহ, সিইটিপি, সার্বজনীন (কমন) ক্রোম রিকভারি ইউনিট পরিপূর্ণভাবে নির্মাণ না হওয়ায় আমরা ব্যবসায়ে মার খাচ্ছি।


তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় প্রতি বর্গমিটার চামড়া অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নির্মাণ হলে প্রতি ঘনমিটার চামড়া যেখানে বিক্রি হতো দুই মার্কিন ডলার, এখন তা বিক্রি হচ্ছে অর্ধেক দামে অর্থাৎ এক ডলার করে। এভাবেই তারা ব্যবসায়ে মার খাচ্ছেন। কমে যাচ্ছে চামড়ার রফতানি আয়। তিনি উল্লেখ করেন, সিইটিপি কমিশনিং এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রিসোর্স জেনারেশনের ব্যবস্থা না হওয়ার কারণে আমরা প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ করেছিলাম; কিন্তু তাদের কথা না শুনেই প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করেছে শিল্প মন্ত্রাণালয়।



এ বিষয়ে চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক জিতেন্দ্র নাথ পাল গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। তবে কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে। এখন সিইটিপি পুরোপুরি কাজ করছে। তবে সিইটিপির জন্য ওয়ার্কশপ, মনিটরিং-ব্যবস্থা চালু করাসহ কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে। তিনি জানান, ব্যবসায়ীরা অহেতুক দোষারোপ করে থাকেন। সরেজমিন গেলে বাস্তব অবস্থা জানা যাবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রকল্পের কাজ আরো এক বছর বৃদ্ধি করা হোক। এ বিষয়ে জিতেন্দ্র নাথ পাল বলেন, এতে ব্যয় আরো বেড়ে যেত। এ কারণে চীনা ঠিকাদারকে বিদায় করে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

তিনি জানান, ট্যানারি শিল্পনগরীতে কঠিন বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় সম্পৃক্ত করে নতুন আরেকটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। আরেকটি সিইটিপি স্থাপন, কঠিন বর্জ্য শোধন ব্যবস্থাসহ ব্যবসায়ীদের জন্য আরো প্লট তৈরি করতে বিদ্যমান ট্যানারি পল্লীর পাশে ২০০ একর জমিতে অপর একটি ট্যানারি পল্লী স্থাপনের জন্য নতুন করে প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে ডিটেইল প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।



জানা গেছে, একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলার জন্য ২০০৩ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। দুই বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০৫ সালে। পরিবেশদূষণ যাতে না হয়, সে জন্য বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যেমন এসটিপি, সিইটিপি, ডাম্পিং ইয়ার্ডসহ যাবতীয় আধুনিক সুবিধা নির্মাণ তথা একটি কমপ্লায়েন্স চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলাই ছিল এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্পগুলো স্থানান্তর করে সাভারে এ আধুনিক মানের শিল্প গড়ে তোলার প্রকল্প নেয়া হয়। শুরুতে কথা ছিল শিল্পনগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ট্যানারিগুলো নিজেরাই ইটিপি স্থাপন করবে। কিন্তু ট্যানারিগুলো তা করছিল না। পরে অনেক দেন-দরবারের পর শিল্প মন্ত্রণালয় প্রকল্পের আওতায় সিইটিপি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ২০১০ সালে প্রকল্প সংশোধন করে। তখন প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় ৫৪৫ কোটি টাকা।

সিইটিপি ও ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণসহ আরো কিছু টেকনিক্যাল কাজ পায় একটি চীনা প্রতিষ্ঠান। ২০১২ সালের মার্চে কোম্পানিকে ২৪ মাস সময় দিয়ে কার্যদেশ দেয়া হয়। পরের বছর সিইটিপিকে আরো যুগোপযোগী করার জন্য সংশোধনীর মাধ্যমে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, সুুয়েজ পাওয়ার জেনারেশন সিস্টেম এবং সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম যুক্ত করে ট্যানারি মালিকদের ২৫০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণসহ মোট প্রকল্প ব্যয় এক হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সিইটিপি নির্মাণকাজের সুপারভিশন ও মনিটরিংয়ের জন্য বুয়েটের বিআরটিসিকে নিযুক্ত করা হয়। প্রকল্পের চতুর্থ সংশোধনীতে এসপিজিএস কম্পোনেন্টটি বাদ দিয়ে প্রাক্কলিত ব্যয় এক হাজার ১৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং সময় জুন ২০২১ পর্যন্ত বাড়ানো হয়।



কিন্তু নিয়োজিত চীনা ঠিকাদার কোম্পানিটি সময়মতো কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। নানা অজুহাতে এ কোম্পানি সময় বাড়াতে থাকে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষও কোম্পানিটির কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে।

জানা গেছে, প্রকল্পের অনেক কাজই অসম্পূর্ণ রেখে ১২ দফা সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩০ জুনে এ প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। এ সময়ে ব্যয় ছয় গুণ বাড়িয়ে ১৭৫ কোটি টাকা এক হাজার ১৫ কোটি টাকা খরচ করা হয়। পরিবেশদূষণ রোধ করে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা ও রফতানি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা জরুরি হলেও তা সম্ভব হয়নি।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ না হওয়ায় লেবার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের পর রফতানির পরিমাণ আরো কমতে থাকে। পরের বছর রফতানি আয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থান হারিয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে চামড়া খাত। যদিও গত বছর সামান্য বেড়েছে বলে পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।

উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, নির্মিত সিইটিপির বর্জ্য পরিশোধনের ক্ষমতা রয়েছে ২৫ হাজার ঘনমিটার। কিন্তু, সারা বছর বর্জ্য হয় ৭৮ হাজার ঘনমিটার। এর মধ্যে কোরবানি ঈদের পর অনেক বেশি চামড়া প্রক্রিয়াকরণের সময় বর্জ্য উৎপাদন হয় প্রায় ৫০ হাজার ঘনমিটার। এতে বর্জ্যরে পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় পুরোপুরি শোধন করার আগেই তা ফেলে দেয়া হয় ধলেশ্বরীর পানিতে। চামড়া শিল্পনগরীর পশ্চিমাংশে ধলেশ্বরী নদীর তীরে উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হচ্ছে ট্যানারির কঠিন বর্জ্য বা সলিড ওয়েস্ট, যা পরিবেশের পাশাপাশি দূষণ করছে নদীকেও। প্রকল্পের সীমানা ভেঙে নদীতে মিশছে উন্মুক্ত পড়ে থাকা চামড়া বর্জ্য। এতে পরিবেশ দূষণ রোধের পরিবর্তে দূষণ বাড়ছে।


উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের আওতায় দুই বছরের মধ্যে সিইটিপি স্থাপন করার কথা থাকলেও চীনা ঠিকাদারি কোম্পানির খামখেয়ালিপনা ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার কারণে তা শেষ হতে লেগেছে সাত বছরেরও বেশি সময়। কিন্তু সেই সিইটিপির পরিশোধন ক্ষমতা পিক সিজনে ট্যানারিগুলোর উৎপাদিত বর্জ্যে মাত্র অর্ধেক। তাই সিইটিপিতে বর্জ্য পুরোপুরি ট্রিটমেন্ট হওয়ার আগেই তা ফেলে দেওয়া হচ্ছে। আর ট্যানারির কঠিন বর্জ্য পরিশোধনের কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। আগে হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো যেভাবে বুড়িগঙ্গার পানিকে বিষে পরিণত করছিল, সেই ভাগ্য বরণ করতে হচ্ছে এককালের টলমলে স্বচ্ছ পানির ধলেশ্বরীকে। অথচ ট্যানারি ও চামড়াজাত দ্রব্যের প্রস্তুতকারী শিল্প মালিকদের মূল চ্যালেঞ্জ হলো কমপ্লায়েন্স।

এ দিকে ট্যানারি মালিকদের প্রকল্পের লিজ দলিল এখনো বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। আবার লিজ বুঝে নিতে যে অর্থের প্রয়োজন তাও মালিকদের হাতে নেই। অবকাঠামো নির্মাণসহ গত ১৯ বছরের ধকল সামলিয়ে উঠতে পারছেন না অনেক উদ্যোক্তা। সবকিছু মিলেই জমি বুঝে পাওয়া মালিকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
সূত্র: নয়া দিগন্ত



বিষয়: চামড়া


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top