নানা ইস্যুতে বিভক্তি বাড়ছে বিএনপিতে

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০২১ ১৮:৩৭; আপডেট: ৬ মে ২০২১ ২১:৪৬

ফাইল ছবি

ক্ষমতায় না থেকেও বিভিন্ন ইস্যুতে প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে বিএনপির বিভক্তি। নেতায় নেতায় দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করেছে। দলের চেয়ে ব্যক্তি স্বার্থে বাড়ছে এ বিভক্তি। দলের এ কঠিন সময়ে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে শক্তভাবেই বিএনপির হাল ধরেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জাতীয় নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে ভালোভাবে সামালও দিচ্ছেন তিনি। কিন্তু তাতে ছন্দপতন ঘটে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কিছু নেতার ‘বাড়াবাড়িতে’।

মির্জা আব্বাসের প্রদত্ত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সেই পরিস্থিতি এখন এতটাই ‘ঘোলাটে’ হয়েছে যে, দলের মধ্যে বিভক্তি ‘চরমভাবে’ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ দ্বন্দ্ব নিরসন না হলে ভবিষ্যতে সার্বিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী।

কথা হয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের সাথে। তিনি বলেন, দলের মধ্যে কোনো একটি বিষয় নিয়ে কথা হতেই পারে, তাই বলে তাকে বিভক্তি বলা কোনোভাবেই ঠিক হবে না। বিএনপি আগের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ আছে।

১৭ এপ্রিল এক ভার্চুয়াল সভায় নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে নিয়ে মির্জা আব্বাসের বক্তব্যের বিষয়টি জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আসেনি। কিন্তু কয়েক নেতা তার ওই বক্তব্যকে পুঁজি করে ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি করেন। দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাসকে বক্তব্যের ব্যাখ্যা চেয়ে এমন ভাষায় চিঠি দেওয়া হয়েছে, যা তার জন্য বিব্রতকর।

কিন্তু এ পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো তার খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, বিএনপিতে এখন অত্যন্ত প্রভাবশালী স্থায়ী কমিটির তিন নেতাই মূল কারণ। দলে আধিপত্য ধরে রাখার জন্য মির্জা আব্বাসসহ দলের স্থায়ী কমিটির অন্তত তিন সদস্য, তিনজন ভাইস চেয়ারম্যান ও চারজন যুগ্ম মহাসচিবকে কোণঠাসা করতে এমনটি করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে এখন বিএনপিতে ‘আমদানি ও খান্দানি’ নামে দুটি শব্দ বেশ আলোচনায়। যারা জিয়াউর রহমানের আমল থেকে বিএনপিতে আছেন কিংবা বিএনপিতে এসেই রাজনীতির হাতেখড়ি; তাদের বলা হচ্ছে খান্দানি। আর যারা অন্য দলের রাজনীতি করে ৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগে-পরে দলে যোগ দিয়েছেন তাদের বলা হচ্ছে আমদানি।

অনেকের প্রশ্ন, দলের এ দ্বন্দ্বের পেছনে মির্জা আব্বাস কী দায়ী নন? কারও মতে, মির্জা আব্বাসের বক্তব্য এমনই। এটি তার স্বভাবসুলভ বক্তব্য। তার অতীত বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে এটি-ই প্রমাণ হবে। দলে থেকে দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন, এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারেনি। তারপরও দলের নেতাকর্মীদের অনেকেই মনে করেন, সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের নেতা হয়ে তার আরও সহনশীল হওয়া উচিত। বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। তার বক্তব্যে যাতে কেউ বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি করতে না পারেন।

মির্জা আব্বাসের ওই বক্তব্যের পর দলের মধ্যে দুটি ধারা চরম আকার ধারণ করেছে। এক পক্ষ মির্জা আব্বাসের বক্তব্যের সমালোচনা করলেও তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা জানার চিঠি দেওয়াকে শোভনীয় মনে করেননি। তাদের মতে, স্থায়ী কমিটির সভায় আলোচনা এবং তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে এর সহজ সমাধান দেওয়া যেত। অপর পক্ষ মনে করেন, দলে সবার জবাবদিহিতা থাকা উচিত। তাই ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। অবশ্য, কেউ কেউ বলেন, অতীতে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের অনেকে বেফাঁস মন্তব্য করেছেন, যাদের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার প্রশ্ন আসেনি।

দলের গুরুত্বপূর্ণ দুই ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, তারেক রহমান দল পুনর্গঠন করে সংগঠন আরও শক্তিশালী করছেন। অন্যদিকে দলের একটি অংশ বিভেদ তৈরিতে ব্যস্ত। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন সকালে যারা ‘ভালো নির্বাচন’ হচ্ছে বলেছিলেন তাদের ব্যাপারে দল কেন ব্যবস্থা নেয়নি। কূটনীতিক উইংয়ের চরম ব্যর্থতার জন্য কে দায়ী? যাদের কারণে সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে যাওয়া মার্কিন মন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেল না বিএনপি-তারা তো জবাবদিহিতার বাইরে আছেন।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, ‘বিএনপিতে বিভক্তির কোনো সুযোগ নেই। তবে নেতাদের ব্যক্তিগত রেষারেষি ও ঈর্ষা পরিহার করা উচিত। ওপরে ওপরে লোক দেখানো ঐক্য দেখালে চলবে না, পারস্পারিক সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতার মাধ্যমে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হবে। সে চেষ্টা আমাদের সবার করতে হবে। এটা আমাদের সবাইকে বুঝতেও হবে।’

তিনি বলেন, একটা কথা সবাইকে বুঝতে হবে- মির্জা আব্বাস বিএনপি ও জিয়া পরিবারের পিলার। দলের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে জিয়া পরিবার এবং বিএনপির আস্থাভাজন নেতা। যদি কেউ হিংসা বা ঈর্ষার কারণে তার ক্ষতি করার চেষ্টা করে আমার বিশ্বাস সেটা আমাদের দলের চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গভীরভাবে বিবেচনা করবেন।

বিএনপির নেতাদের মধ্যে যারা দলের জন্মলগ্ন থেকে রাজনীতি করছেন কিংবা যাদের রাজনীতি বিএনপিতে শুরু; তাদের অনেকেই এখন কোণঠাসা। স্থায়ী কমিটিতে এমন অনেক নেতা আছেন যাদের সঙ্গে নেতাকর্মীদের যোগাযোগ খুবই কম। দলীয় কর্মসূচিতে তেমন আসেন না। নয়া পল্টন কার্যালয়ে তাদের দেখা মেলে না। ওই নেতারা বলে বেড়ান; তারাই এখন দলের সব। সব সিদ্ধান্ত তারা নেন। তাদের সিদ্ধান্তই তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত। মূলত ওই নেতারাই দলের একটি অংশের নেতাদের কোণঠাসা করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

নয়াপল্টন ও গুলশান কার্যালয় সংশ্লিষ্ট নেতাদের সূত্রে জানা যায়, কিছুদিন আগে দুই ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, শওকত মাহমুদকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে শোকজ করা হয়েছিল। মূলত, তারা সরকার বিরোধী আন্দোলনের পক্ষের নেতা। কিন্তু তারেক রহমানকে ভুল বুঝিয়ে ওই শোকজ করা হয়েছিল। সেই শোকজ দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত রুহুল কবির রিজভী পাঠানোর কারণে তারও সমালোচনা করা হয়েছে।

দলের পরিস্থিতি এমন অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে দলের কিছু নেতা সাপ হয়ে ছোবল মারে, আবার ওজা হয়ে ঝাড়ে। মাঝখান দিয়ে বিতর্কিত হন তারেক রহমান। চেয়ারপারসনের একাধিক উপদেষ্টা বলেন, দলে যারা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের লোক তাদের নানাভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে। একপর্যায়ে জিয়া পরিবারের আস্থাভাজন নেতাদের হাইকমান্ডের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে ষড়যন্ত্রকারী নেতারা তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছেন।

দলের চেয়ারপার্সন কারাগারের যাওয়ার দিন থেকে বিএনপি যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে তাদের অনেক সিদ্ধান্ত-ই সঠিক ছিল না বলে মনে করেন নেতাকর্মীরা। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর ড. কামালের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট গঠন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপ, কোনো দাবি না মানলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ, নির্বাচনের পরের দিন ফলাফল প্রত্যাখ্যান ও প্রতিবাদে কর্মসূচি না দেয়া, সংসদে যোগদান ইত্যাদি কোনোটাই সাধারণ নেতাকর্মীদের মনের মতো হয়নি। যার দায়ভার দলের সিনিয়র নেতারা কেউই নেননি। বরং অনেক নেতাকেই বলতে শোনা যায়, এসব ভুল সিদ্ধান্তের জন্য তারেক রহমান দায়ী।

 

  • এসএইচ


বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top