কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সূফীবাদ

শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন | প্রকাশিত: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩ ১১:৫৬; আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৪ ১৯:৪০

ফাইল ছবি

ইসলামের প্রথম যুগে মুসলমানগণ নিঃশর্তভাবে কুরআন ও সুন্নাহ্র অনুসরণ করে চলতেন। তাঁরা নির্দিষ্ট কোন মাজহাব, ত্বরীকা বা মতবাদের দিকে নিজেদেরকে নিসবত (সম্পৃক্ত) করেননি। সকলেই মুসলিম বা মুমিন হিসেবে পরিচয় দিতেন। তবে ‘বদরের যুদ্ধ যেহেতু ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বা যুদ্ধ ছিল এবং তাতে অংশগ্রহণ করাও ছিল বিশেষ একটি ফজীলতের কাজ, তাই যারা বদরের যুদ্ধে শরীক হয়েছেন তাঁদেরকে বদরী সাহাবী, যারা বাইআতে রিযওয়ানে অংশগ্রহণ করেন তাঁদেরকে আসহাবে বাইআত এবং দ্বীনি ইলম শিক্ষায় সর্বক্ষণ আত্মনিয়োগকারী সুফ্ফাবাসী কতিপয় সাহাবীকে ‘আসহাবে সুফ্ফা’ বলা হতো।’

পরবর্তীতে মুসলমানগণ রাজনৈতিক, নিজস্ব ধর্মীয় মতবাদসহ অন্যান্য কারণে বিভিন্ন দলে এবং উপদলে বিভক্ত হয়। মুসলমানদের মাঝে আত্মপ্রকাশ করে শিয়া, খারেজী, মুতাজেলা, কদরীয়া, আশায়েরা, জাহমেয়ীসহ আরও অসংখ্য বাতিল ফির্কা বা মতবাদ। এর ধারাবাহিকতায় একসময় সূফীবাদও একটি ধর্মীয় মতবাদ হিসেবে মুসলমানদের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করে। তবে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত্ব প্রমাণ করে প্রকৃত সূফীবাদ বা কুরআনিক সূফীবাদ ‘আসহাবে সুফ্ফা’ থেকেই উৎপত্তি।

সূফী মতবাদ কখন থেকে ইসলামে আত্মপ্রকাশ করে তার সঠিক সময় নির্ধারণ করা কঠিন। বিভিন্ন সূত্রের বর্ণনা মতে, ‘এই মতবাদটি হিজরী তৃতীয় শতকে ইসলামী জগতে ছড়িয়ে পড়ে। তখন শুধুমাত্র কতিপয় লোকের ব্যক্তিগত প্রবণতা, আচরণ ও আগ্রহের মধ্যেই এটি সীমিত ছিল। তাদের দুনিয়ার ভোগবিলাস ও আরাম-আয়েশ পরিহার করে ইবাদতে মশগুল হওয়ার আহবান জানানোর মধ্য দিয়েই এ পথের যাত্রা শুরু। পরবর্তীতে ব্যক্তিগতভাবে গড়ে উঠা আচরণগুলো উন্নতি লাভ করে একেকটি মতবাদে পরিণত হয়। আর প্রখ্যাত সূফীদের নামে বিভিন্ন ত্বরীকারও আবির্ভাব ঘটে।’

পবিত্র কুরআনের আলোকে প্রকৃত সূফীবাদ এর মূল নির্যাস হচ্ছে ‘(সুতুরাং) তোমরা আমাকেই স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করবো। তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না। হে মুমিনগন! ধৈর্য্য ও সালাতের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ধৈর্য্যশীলদের সাথে আছেন। আল্লাহ্র পথে (রাস্তায়) যারা নিহত হয়, তাদেরকে মৃত বলিও না বরং তারা জীবিত; কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারোনা। আল্লাহ্ তায়ালা আরো বলেন ‘জেনে রাখো! আল্লাহ্র বন্ধুদের কোন ভয় নাই এবং তারা দুঃখিতও হবেনা। যারা ঈমান আনে এবং তাক্ওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য আছে সু-সংবাদ দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে। আল্লাহ্র বাণীর কোন পরিবর্তন নাই; উহাই হল মহাসফল্য। তাদের কথা তোমাকে যেন দুঃখ না দেয়। সমস্ত শক্তিই (ক্ষমতা) আল্লাহ্ তায়ালার, তিনি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ।’

হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ্ তা’আলা বলেন- যে ব্যক্তি আমার ওলী’র (বন্ধু) সাথে শত্রুতা করে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করছি। আমার বান্দার প্রতি যা ফরয করেছি, তা দ্বারাই সে আমার অধিক নৈকট্য লাভ করে। আমার বান্দা নফল কাজের মাধ্যমেও আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে। অবশেষে আমি তাকে ভালবেসে ফেলি। যখন আমি তাকে ভালবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে এবং তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলাফেরা করে। সে আমার কাছে কিছু চাইলে, আমি তাকে তা দেই। সে যদি আমার নিকট আশ্রয় কামনা করে, তাহলে আমি তাকে আশ্রয় দেই। আমি যা করার ইচ্ছা করি, সে ব্যাপারে আমি কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগি না কেবল মুমিনের আত্মার ব্যাপার ছাড়া। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে আর আমি তার মন্দকে (কষ্ট) অপছন্দ করি।
সূফীদের মূল বিশ্বাসের আরেকটি অংশ হচ্ছে ‘ইলাহ্ তিনিই, যিনি যাবতীয় প্রশংসার যোগ্য। সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ যাবতীয় শ্রেষ্ঠত্ব তাঁরই জন্য। একমাত্র তিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ্ নেই, তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই। নেই কোনো উপমা, তাঁর কোনো শরীক নেই, নেই কোনো সাদৃশ্য। আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।’

সূফীরা দুনিয়ার ভোগ-বিলাস পরিহার করে সরল সোজা ও সাদামাটা জীবন যাপন করেন। ফলে তাদের চিন্তা চেতনা আচার-আচারণ একটু ভিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন ‘রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, ‘এলোমেলা চুল বিশিষ্ট বহু লোক রয়েছে, যারা আল্লাহ্র উপর ভরসা করে কোন ব্যাপারে শপথ করলে আল্লাহ তায়াল তা সত্যে পরিণত করে দেন।’ সুওয়ায়দ ইবনু সাঈদ (রহ.), আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: এমন অনেক আলুথালু কেশধারী মলিন চেহারা বিশিষ্ট দরজা থেকে বিতাড়িত (নিগৃহীত অধ:পতিত) হয়েছে, যারা আল্লাহ্র নামে কসম করলে আল্লাহ্ তা সত্যে পরিণত করে দেন।’ বর্তমান সময়ে দেশ-দেশান্তরে মূল তাসাউফ চর্চার অবনতি লক্ষ্য করে অনেকের ধারণা, সত্যিকার তাসাউফ বলতে বর্তমানে আর কিছুই নেই? কিন্তু একটি কথা মনে রাখতে হবে, আসল দ্বীন বা তাসাউফ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এঁর প্রেমের সাথে আল্লাহ্র হুকুম ও আহকাম পালন করা। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, (এবং বল), ‘সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; মিথ্যা তো বিলুপ্ত হবারই।’ আর,‘যারা আল্লাহ্র সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করবে তারা সফলকাম হবে না।’ তাই একজন মুত্তাকি মসুলমান হিসেবে আল্লাহ্ সুবহানু তায়ালার দাস হয়ে তাঁর প্রতি একাগ্রতা ও অনুগত্যতা থাকে তবে এই তাসাউফ এর চেয়ে উত্তম আর কিছুই হতে পারে না।

সুফিজমে বিভিন্ন ধরণের সিম্বল ব্যবহারের প্ররচলন আছে।।

সূফীবাদ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা
তাসাউফ তথা সূফীবাদ পবিত্র ইসলাম ধর্মের একটি রহস্যময় আধ্যাত্মিক মতবাদ। এ মতবাদের লক্ষ্য হচ্ছে, ‘মহান আল্লাহ্ তায়লার নিগূঢ় অনুভূতি অন্বেষণের মাধ্যমে আত্মার পবিত্রতা অর্জন করে মানবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন। কুরআনিক সূফীগণ পবিত্র কুরআন ও হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এঁর অমীয় বাণীকে তাসাউফ বা সূফীবাদের মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। সূফীগণ আল্লাহ্র ধ্যানে এবং প্রেমে এমনভাবে মগ্ন থাকেন যে, তাঁদের অন্তর থেকে পার্থিব বস্তুর প্রতি সকল মোহ নিঃশেষ হয়ে যায়।

হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এঁর মাদানী জীবনে একদল সাহাবী মসজিদে নববীর বারান্দায় অবস্থান করতেন। তাঁরা ন্যূনতম সাংসারিক প্রয়োজন ব্যতীত সবসময় যাহেরী-বাতেনী আলোচনা ও ধ্যান-ধারণা অর্জনের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- কেঁ ছায়ার মতো সার্বক্ষনিক অনুকরণ ও অনুসরণ করতেন। মূলত তাঁদেরকে আসহাবে সূফ্ফা বা আহ্লে সূফ্ফা অর্থাৎ বারান্দার অধিবাসী বলা হয়। আর ‘আসহাবে সূফ্ফা বা আহ্লে সূফ্ফাগণই সূফী সাধনার ইতিহাসে প্রকৃত সূফী। তাঁরা একমাত্র আল্লাহ্র হুকুম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলতেন।

সূফীগণ হচ্ছেন মহান আল্লাহ্ তায়ালার ওলি বা আল্লাহ্র নৈকট্য লাভকারী প্রিয় বান্দা। আর সূফী সাধনায় পবিত্র কুরআনের মূল তাৎপর্য ও রহস্য যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সিনা-ব-সিনা আমাদের সময় পর্যন্ত চলে এসেছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা চলমান থাকবে। আহ্লে সূফ্ফার অন্যতম সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায় ‘শরীয়তের যাহেরী ইল্ম প্রকাশযোগ্য, কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক প্রদত্ত ইল্মে বাতেনী সূফী বা আল্লাহ্ ওয়ালা ব্যতীত সর্বসাধারণের নিকট প্রকাশযোগ্য নয়, কেবল লতিফা দ্বারা উপলব্ধিযোগ্য।

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) আরও বলেন,‘আমি রাসূল (সাঃ) থেকে দু’প্রকার ইল্ম লাভ করেছি। এক প্রকার ইল্ম আমি সর্ব সর্বসাধারণের নিকট প্রচার করেছি, আর এক প্রকার বিশেষ ইল্ম প্রকাশ করিনি। যদি তা প্রকাশ করতাম তাবে আমার খাদ্যনালী কর্তন করা হতো।’ তবে আহলে সুফ্ফা সাহাবীগণ (রা.) এঁর সময় বা তাঁদের পরবর্তী বহুকাল সময় পর্যন্ত কোন ‘ত্বরিকা’ নামক ইসলামী মতবাদের উদ্ভব হয়নি।

আসহাবে সূফ্ফাগণের বৈশিষ্ট্য
আসহাবে সূফ্ফা সাহাবীগণ (রা.) বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। এর মধ্যে-
০১. আসহাবে সূফ্ফা সাহাবীগণ পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী ছিলেন।
০২. তাঁরা পবিত্র কুরআনের যাহেরী-বাতেনী শিক্ষা ও নবী কারিম (সাঃ) এঁরসাথে বিশেষ আদর্শ (সম্পর্ক) স্থাপনকারী সাহাবা ছিলেন।
০৩. আসহাবে সূফ্ফা সাহাবীগণ অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন।
০৪. ন্যূনতম প্রয়োজন ব্যতিত তাঁরা কখনও মসজিদে নববীর বাইরে যেতেন না। এমন কি অপ্রয়োজনীয় বাক্যালাপও করতেন না।
০৫. এসকল সাহাবাগণ যিকির, ফিকির, মোরাকাবা ও মোশাহেদায় সর্বদা লিপ্ত থাকতেন।
০৬. তকদীর, রূহ, নফস, প্রভৃতি কঠিন বিষয় সম্পর্কে গভীর আলোচনা পর্যালোচনা করতেন।
০৭. আসহাবে সূফ্ফা সাহাবীগণ নবী করীম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এঁর সাথে এতোই ঘনিষ্ঠভাবে অবস্থান করার সুযোগ পেতেন যে, অজানা অনেক আধ্যাত্মিক তত্ত্ব বিষয়ক রহস্য যা সবার কাছে প্রকাশ নিষিদ্ধ এ সম্পর্কিত বিশেষ তালিম লাভ করেন। শুধুমাত্র চার খলিফাসহ মাত্র কতিপয় সাহাবী (রা.) এসব বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন।
০৮. আসহাবে সূফ্ফা সাহাবীগণ সাধারণ সাহাবীদের চাইতে বিশেষ মর্যদার অধিকারী ছিলেন।
উল্লেখযোগ্য আসহাবে সূফ্ফা সাহাবীগণের মধ্যে রয়েছেন ‘হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.), হযরত উমর ফারুক (রা.), হযরত ওসমান গণি (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত সালমান ফারসী (রা.), হযরত আবু হুরায়রা (রা.), হযরত মায়াজ (রা.), হযরত আবদুল্লাহ আল-জুল বুজদাইন (রা.) প্রমুখ সাহাবীগণ (রা.)।’

আসহাবে সূফ্ফাগণ রাসূল (সা.) কেঁ এতো বেশি ভালোবাসতেন যার বরকতে ‘(তাঁরা) নিজেদের জীবন, ধন-সম্পদ, স্ত্রী-পুত্র সকল কিছু আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এঁর জন্য কোরবানী করে ‘ফানাফিল্লাহ্ ও ফানা-র্ফি-রাসূল’ হয়ে যান। এমন কি তাঁদের অনেকেই ‘কাপড়ের অভাব বা বেশ-ভূষার প্রতি অনীহার কারণে পশমের কম্বল বা পশমের কাপড় বা মোটা কাপড় পরিধান করতেন। মূলধারার তাসাউফ বা সূফীবাদের ধারা আহলুস সূফ্ফা থেকে উৎপত্তি এবং তাঁদের জীবন ধারণ ও শিক্ষার অন্তর্নিহিত তত্ত্ব¡ ও ভাবধারার মধ্যদিয়ে তাসাউফ বা সূফীবাদের প্রসার লাভ করেছে।

শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top