হাওয়ার বিরুদ্ধে মামলাকারী কর্মকর্তাকে শোকজ, পরিবেশবাদীরা যা বলছেন

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ২০:৩০; আপডেট: ২ অক্টোবর ২০২২ ১৬:১১

ছবি : সংগৃহীত

সম্প্রতি শালিক পাখিকে খাঁচায় বন্দি রাখাসহ পুড়িয়ে খাওয়ার ঘটনায় রীতিমতো সব মহলেই আলোচনার তুঙ্গে উঠেছিল ‘হাওয়া’ চলচ্চিত্র। প্রথমে বন বিভাগের মামলা ও পরে তা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলো ছিল সিনেমাপ্রেমীদের নিত্যদিনের আলোচনায়। ওই ঘটনায় সবশেষ সিনেমাটির বিরুদ্ধে মামলা করা বন বিভাগের কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে। এতে আবারও নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে চলচ্চিত্রটি।

পরিবেশবাদীরা বলছেন- বন ও পরিবেশ রক্ষায় আইন বাস্তবায়নে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক নারগিস সুলতানা শোকজ খেলে আইনটি প্রণয়নকারী এমপি-মন্ত্রীরা কেন শোকজ খাবেন না? এছাড়াও একই আইনে এ যাবৎ প্রায় ১২৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে সেগুলোরই বা কী হবে? যারমধ্যে এই আইনের একই ধারায় গ্রামীণফোনসহ কয়েকটি নাটক ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে সফল হয়েছিল বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট।

শোকজের বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হয় বেশ কয়েকজন পরিবেশবাদীদের সঙ্গে। পাঠকদের জন্য শোকজ নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া নিচে তুলে ধরা হলো-

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জোট বাংলাদেশ প্রকৃতি সংরক্ষণ জোটের (এনসিএ) আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, বন বিভাগ পরিবেশ রক্ষায় সমস্যাগুলো সুস্পষ্টভাবে সমাধান করতে পারে না। তবে চেষ্টা করে। হাওয়া সিনেমা সংশ্লিষ্টরা জানেন এবং আইনের বিষয়ে অবগত রয়েছেন। পরিচালক নিজেও একটি টিভি চ্যানেলকে বলেছেন- আইন সম্পর্কে তিনি অবগত। এছাড়াও এনসিএ পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিভিন্নভাবে তাদের সাথে যোগাযোগ করেছে। নিজেদের ভুল জানার পর সিনেমা কর্তৃপক্ষ অপরাধ ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন। তাহলে এতদূর সমস্যাটা না গড়িয়ে সমাধানের পথে যেতে পারত।

হাওয়ায় আইনের লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরে চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার হাসান শাহরিয়ার। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তথ্যমন্ত্রী শোকজের কথা বলেছেন, এটা তিনি কেন বলবেন? আইন ভঙ্গ হওয়ায় সরকারি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই মামলা হয়েছে। পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা ৩৩টি সংগঠনের একটা দাবি ছিল, যার প্রেক্ষিতে অপরাধ দমন ইউনিট তদন্ত করেন।

হাসান শাহরিয়ার বলেন, সিনেমাটির পরিচালক নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন এবং বলেছেন- আইন জানতেন না। অন্যদিকে তথ্য মন্ত্রণালয় নিজের দোষ অন্যর কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে দিয়ে অপরাধ ইউনিটের মনোবল ভেঙে দিয়েছে। যা সমাজে একটা অস্থিরতা দেখা দেবে। নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া শোকজ করে আইনের প্রয়োগে বাধা দেওয়া হয়েছে।

সেন্সর বোর্ডকে পুনর্গঠন প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বলেন, যারা পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন, বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করেন তাদের সেন্সর বোর্ডে যুক্ত করা প্রয়োজন। তখন সমস্যাগুলো সেন্সর বোর্ড থেকেই সমাধান হয়ে যাবে।

শোকজের বিষয়টি নিয়ে পিপল অফ এনিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও বিএনসিএ’র অন্যতম নেতা স্থপতি রাকিবুল হক এমিল বলেন, বন উজাড় বা বন্যপ্রাণী ধ্বংস করার সঙ্গে সাধারণ মানুষ নয়, সমাজের ভিআইপি লোক জড়িত থাকে। তখনি জাতীয় স্বার্থে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে শোকজ পেতে হয়, তারা নিরুৎসাহিত হওয়া স্বাভাবিক। হতাশা ধরে বসবে তাদের। এখনও যে আপস হয়েছে, সেখানে আইন ভুল ছিল তা কিন্তু নয়। আইনের মধ্যে থেকেই সমঝোতা হয়েছে।

বিষয়টিতে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, ‘সরকারের একজন মন্ত্রী তিনি। মামলাটিও চলমান, যা এখনও পুরোপুরি সমাধান হয়নি, তার আগেই তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজের নামে হুমকি দিয়েছেন। এটা অত্যন্ত অন্যায়। আমরা পরিবেশবাদীরা একটা দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্যই হাওয়া সিনেমার বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। এটা যে হাওয়ার জন্য বদনাম তা নয়। এতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে দেশে সচেতনতা তৈরি হয়েছে।’

ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, ‘এখন যে হুমকি দেওয়া হয়েছে এর ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আইন প্রয়াগের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মন্ত্রীরাই আইন মানছেন না। তথ্যমন্ত্রী যা করেছেন, এটা পক্ষপাতদুষ্ট হয়েছে। এ হুমকি নিয়ে আমরা পরিবেশবাদীরা উদ্বিগ্ন। সরকারের কোনো মন্ত্রীর এমন হস্তক্ষেপ আইন বিরোধী। শোকজের অর্থ কেউ আর মামলায় যাবে না। কেউ আর পাখিকে মারল, কি মারল না এটা নিয়ে চিন্তা করবে না। এটা হতাশার এবং এর তীব্র নিন্দা জানাই।’

পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিষয়ক সাংবাদিক কেফায়েত শাকিল বলেন, বন বিভাগের প্রচুর ব্যর্থতা আছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভালো কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। কারও বাড়িতে বন্দি প্রাণী থাকলে ৯৯৯ এ কল দেওয়ার পর এই ইউনিটকে খবর পাঠানো হয়। তারা দেরি না করেই ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। সেই সঙ্গে প্রাণীটি যেন মারা না যায়, উদ্ধার করে বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ইউনিটে মাত্র সাতজন কাজ করলেও তারা জেলা প্রতিনিধিদের নিয়ে কাজ করে।

কেফায়েত শাকিল বলেন, হাওয়া ইস্যুর আগে গ্রামীণফোনসহ কয়েকটি নাটকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। একজন টেলিভিশন প্রেজেন্টারের বিরুদ্ধেও তারা ব্যবস্থা নিয়েছিল। একই আইনে প্রায় ১২৫টির মতো মামলা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন ওঠে- এতদিন অপরাধ হলেও, আজ অপরাধ হচ্ছে না কেন? হাওয়ার পেছনে প্রযোজক কোম্পানি বড় বলেই কি সমস্যা? না কি সামাজিক মাধ্যমে কিছু মানুষের আবেগী মন্তব্যর জন্যই এ অবস্থা? না কি বিশেষ কিছু ব্যক্তিকে দেখেই এই ব্যবস্থা? তাহলে সেলিব্রেটিরা অপরাধ করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে না?

তিনি বলেন, ‘একজন মন্ত্রীর সরাসরি এমন মন্তব্যে আমার কাছে মনে হয় আইন হেরে গেছে। ভালো কাজের জন্য তিরস্কার করা হয়েছে। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনটি সংসদে পাস হয়েছে ২০১২ সালে। সেই সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তাঁর হাতেই পূর্ণতা পায় আইনটি। এই আইনের ৩৮ (১-২), ৪১ ও ৪৮ ধারায় হাওয়া চলচ্চিত্রের পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট।’

এর আগে একই আইনে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, গ্রামীণফোন একটা কমার্শিয়াল এরিয়া কিন্তু হাওয়া ইনক্রিয়েশন এরিয়া। আইনে বলা আছে- প্রাণী নিধন করা যাবে না। এটা স্বাভাবিক সময়ের জন্য। ওখানে বলা হয়নি- সিনেমার মধ্যে করলে অপরাধ হবে। প্রয়োজনে আইনকে নাটক সিনেমার আওতামুক্ত করতে হবে।

এ বিষয়ে পরিবেশবাদী আদনান আজাদ আরিফ বলেন, তদন্ত কর্মকর্তাকে হেয় করার জন্যই শোকজ করা হয়েছে। এমন বাস্তবতায় যে অপরাধ বাড়বে, তা তো উদ্বেগের। তাদের কনফিডেন্স কমে যাবে। অনেকেই মনে করেছে, হাওয়া সিনেমায় শালিক বন্দি করায় ২০ কোটি টাকা আদায় করা হচ্ছে। বিষয়টা এমন নয় যে, এ টাকা খেয়ে ফেলবেন। এ টাকায় সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতেন। এ মামলার মাধ্যমে মানুষ জেনেছে বন্যপ্রাণী আটক রাখা অপরাধ, কিন্তু শোকজের মাধ্যমে মানুষ জানবে- এটা অপরাধ না। যে সকল নামধারী পরিবেশবাদী পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বা হাওয়ার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তাদের জ্ঞানের অভাব রয়েছে।

বিষয়টিতে বন অধিদফতরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের সাবেক পরিচালক এ এস এম জহির আকন বলেন, পরিবেশ রক্ষায়, প্রকৃতি রক্ষায় সরকারে কতোগুলো বিভাগ রয়েছে, যেখানে শৃঙ্খলা বাস্তবায়নে আইন লিপিবদ্ধ রয়েছে। আমি দেড় মাস আগে ওখানে ছিলাম, সে কারণে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

তবে সাবেক বন সংরক্ষক ইশতিয়াক উদ্দিন আহমদ বলেন, এই শোকজের ফলে এ ইউনিটের কাজের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। যেহেতু আইন আছে, অপরাধ করলে ব্যবস্থা নেবেন- এটাই স্বাভাবিক। তবে কতটা প্রভাব পড়বে তা বলা কঠিন। যা হওয়ার হয়ে গেছে। হবে এটা সকলের জন্য একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়ে থাকবে যে- আইন আছে, আইনের প্রয়োগ আছে।

সিনেমাকে আইনের বাইরে রাখা যায় কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিনেমা আইনের বাইরে রাখা যৌক্তিক নয়। তবে সিনেমায় বন্যপ্রাণী দেখানোর ক্ষেত্রে ডিসক্রেইমার দেওয়া যেতে পারে। বলে দিতে হবে, এখানে বন্যপ্রাণীর কোনো ক্ষতি হয়নি। বন্যপ্রাণী নিয়ে কোনো নেতিবাচক দৃশ্য দেখানো যাবে না।



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top