পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যা : নেপথ্যে গলিত হিমবাহ ও বৃক্ষনিধন
রাজটাইমস ডেস্ক: | প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৫ ২১:০০; আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৫ ০৪:৪৭

এটি ছিলো একটি সাধারণ দিন। ২৬ বছরের মুন্তাজির মেহেদি বিকেলের নামাজ শেষ করেছিলেন। দুপুরের খাবার খাওয়ার পর পাহাড়গুলো হঠাৎ গর্জন শুরু করল।
চোগোগরুং গ্রামের এই দর্জি জানতেন তাকে কী করতে হবে-পালাতে হবে!
সিয়াচেন হিমবাহের (বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নন-পোলার হিমবাহ) পাদদেশে বসবাসকারী মেহেদিকে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে জুলাইয়ের শেষ দিকে ঘর ছেড়ে পালাতে হয়। কারণ সেখানে হিমবাহ গলনে একটি হ্রদ ভেঙে যায়।
মেহেদি বলেন, 'আমরা বুঝতে পারছিলাম কিছু ঘটতে যাচ্ছে। পাথরের শব্দ খুব জোরে হচ্ছিল আর পানির স্রোত হঠাৎ থেমে যায়, আমাদের কাছে সামান্য সময় ছিলো উঁচু জায়গায় দৌঁড়ে গিয়ে বাঁচার জন্য। কিন্তু আমাদের সবকিছু—ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, জীবনের সঞ্চয়—কয়েক মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল।'
পরিবারটি হেঁটে প্রায় ১০০ কিলোমিটার (৬০ মাইল) দূরের এক গ্রামে পৌঁছে। সেখান থেকে গাড়িতে উঠে তারা স্কারদু শহরে যায়।
এমন আরো অনেক গল্প উঠে এসেছে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গিলগিত-বালতিস্তান থেকে।
পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের এই অঞ্চলে বিশেষ করে ঘিজার জেলায় বন্যায় গ্রামগুলো তলিয়ে গেছে।
পাকিস্তান এখন নানা ধরনের জলবায়ু সংকটে পড়েছে। যেমন- বনভূমি কমছে, হিমবাহ আগের তুলনায় দ্রুত গলছে, আর ভয়াবহ বৃষ্টিপাতে গ্রামগুলো ধ্বংস হচ্ছে।
বন উজাড় হওয়ায় প্রাকৃতিক সুরক্ষা দুর্বল হয়েছে। পর্বতের উষ্ণতা হিমবাহকে দুর্বল করে দিচ্ছে, পাহাড়ি জমি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে, ঝুঁকি বাড়ছে ভূমিধস ও বন্যার।
এই হুমকিগুলো এ বছর একত্রে আঘাত হেনেছে মৌসুমি বৃষ্টি আর বিরল মেঘফাটার ঘটনা যা পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর ও খাইবার পাখতুনখোয়ার উত্তরাঞ্চলে তাণ্ডব চালিয়েছে।
সেই পানি নেমে গিয়ে পাকিস্তানের অন্য অংশেও ধ্বংস ডেকে এনেছে। নদীর ধারে ও প্লাবনভূমিতে বসতি গড়ে তোলার কারণে ক্ষয়ক্ষতি আরো বেড়েছে।
এ বছরের বর্ষায়, ২৬ জুন থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৮০৪ জন মারা গেছে। তাদের অধিকাংশ খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের।
পাকিস্তানের হিমবাহে কী ঘটছে?
২০২৪ সালে ইতালির গবেষণা সংস্থা EvK2CNR এক গবেষণায় জানিয়েছে—পাকিস্তানে ১৩ হাজার ৩২টি হিমবাহ আছে। এগুলো ১৩ হাজার ৫৪৬ দশমিক ৯৩ বর্গকিলোমিটার (৫,২৩০ বর্গমাইল) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত যা গিলগিত, ইন্দুস, ঝিলম, কাবুল ও তারিম নদী অববাহিকায় রয়েছে।
পোলার অঞ্চলের বাইরে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি হিমবাহের বরফ মজুদ আছে পাকিস্তানে।
হিন্দুকুশ, হিমালয় আর কারাকোরাম—তিনটি প্রধান পর্বতমালার মিলনস্থল রয়েছে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে।
এই হিমবাহ পাকিস্তানের ২২ কোটি মানুষের পানির বড় উৎস।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আইসিমোড (ICIMOD)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০১১-২০২০ সময়ে হিন্দুকুশ ও হিমালয়ের হিমবাহ গলনের হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে।
বালতিস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন পরিচালক জাকির হুসাইন জাকির জানান, হিমালয়ে প্রতি বছর ১০-৩০ মিটার, হিন্দুকুশে ৫-১০ মিটার, আর কারাকোরামে ২-৩ মিটার হারে বরফ গলছে। গ্রীষ্ম দীর্ঘ হওয়ায় নতুন তুষার পড়লেও বরফ পূরণ হচ্ছে না।
জলবায়ু সংগঠন সিএফপি’র উপদেষ্টা দাওয়ার হামীদ বাট বলেন, 'গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে গলন দ্রুত হয়েছে, অথচ এতে পাকিস্তানের অবদান খুবই সামান্য।'
উষ্ণতা হিমবাহ গলন বাড়ায়। বরফ গলে গেলে নিচের কালো পাথর উন্মুক্ত হয়। সেই পাথর আরও বেশি তাপ শোষণ করে, আবারো বরফ গলন বাড়ায়।
পিডিএমএ (Provincial Disaster Management Authority) প্রধান জাকির হুসাইন বলেন, 'আগে আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠরা বলতেন, ১৫ আগস্টের পর বরফ গলন থেমে যেত আর তুষার জমা শুরু হতো। এখন আর তা হয় না।'
দ্রুত হিমবাহ সরে আসায় পার্বত্য এলাকা দুর্বল হয়ে পড়ছে, বাড়ছে ভূমিধসের ঝুঁকি।
বালতিস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের জাকির বলেন, পর্যটন ও নির্মাণকাজও হিমবাহ গলনে ভূমিকা রাখছে। ২০০৫ সালে স্কারদু বিমানবন্দর বড় করার পর থেকে প্রতিদিন বড় আকারের উড়োজাহাজে পর্যটক আসছে।
জাকির বলেন, 'বেশি বিমান চলাচল হিমবাহ গলনের অন্যতম কারণ।’
তবে পিডিএমএ’র হুসাইন বলেন,'গিলগিত-বালতিস্তানে কোনো শিল্প নেই। আমরা খুব কম কার্বন নির্গমন করি। ভুক্তভোগী আমরা।'
পাকিস্তানের বন নিয়ে কী ঘটছে?
পাকিস্তানের ভূপ্রকৃতি বৈচিত্র্যময়—উঁচু পাহাড়, উর্বর সমভূমি, মরুভূমি ও নদী উপত্যকা। শুকনো অঞ্চল ও বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলের মধ্যে তীব্র বৈপরীত্য রয়েছে।
ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির তথ্যমতে, পাকিস্তানের দুই দশমিক ৭২ শতাংশ ভূমি বরফ ও তুষারে ঢাকা—পোলার অঞ্চল ছাড়া সবচেয়ে বেশি। এসব হিমবাহ ইন্দুস নদী ব্যবস্থাকে খাওয়ায়, যা দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষিকে টিকিয়ে রাখে।
তবে বনভূমি মাত্র পাঁচ দশমিক ২৩ শতাংশ, যা ভূমিক্ষয় ও বন্যা ঠেকাতে খুবই অপ্রতুল।
মৌসুমি বৃষ্টিতে দক্ষিণ এশিয়ার তিন-চতুর্থাংশ বৃষ্টিপাত হয়, যা পাকিস্তানের কৃষির জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু গত এক দশকে মেঘফাটা আর ভারী বৃষ্টিতে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস বেড়েছে।
গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পাকিস্তান ৯৫ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার বনভূমি হারিয়েছে—যা রাজধানী ইসলামাবাদের অর্ধেক আকারের সমান।
কেন গাছ কাটা হচ্ছে?
২০০১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পাকিস্তান প্রায় ৮ শতাংশ বন হারিয়েছে।
এর মধ্যে ৭৮% গাছ কাটা হয়েছে কাঠ আহরণের জন্য। এরপর বন হারানোর কারণ হলো অগ্নিকাণ্ড (১২%), কৃষি জমি (৪৯২ হেক্টর), প্রাকৃতিক দুর্যোগ (১৮৪ হেক্টর), আর নতুন বসতি ও অবকাঠামো (১৭৯ হেক্টর)।
খাইবার পাখতুনখোয়ার বন কর্মকর্তা আহমেদ কামাল বলেন—সরকারি নীতির কারণে বন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
১৯৯০-এর আগে সেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাঠ কাটা হতো। তবে টিম্বার মাফিয়া অপব্যবহার করায় সরকার সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
এই নিষেধাজ্ঞায় স্থানীয়রা আয় হারায় এবং অনেকেই অবৈধভাবে ছোট গাছ কাটতে শুরু করে। এতে পাকিস্তানের দামী দেবদারু বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এনজিও এসসিএন-এর আদিল জারিফ বলেন—২০২৩-২৪ সালে খাইবার পাখতুনখোয়ার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘গুজারা বনভূমি’ রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেয়। এই বনভূমি স্থানীয় উপজাতি বা ব্যক্তিদের ঐতিহ্যগত অধিকারে ছিল।
জলবায়ু সংগঠন সিএফপি’র বাট বলেন—বন উজাড়ের ফলে পানি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ফলে গ্রামগুলো অসহায় হয়ে পড়ছে।
খাইবার পাখতুনখোয়ার বুনের ও সোয়াবির মতো জেলায় এক ঘণ্টায় ১৫০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়েছে। তাতে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে গ্রাম ভেসে গেছে।
এর প্রভাব কি অন্য অঞ্চলেও পড়ছে?
উত্তরের বন্যার পানি নেমে এসে পাঞ্জাবের শিল্পাঞ্চলেও তাণ্ডব চালাচ্ছে। সিয়ালকোটে এক দিনে ৩৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা ৪৯ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে।
এমনকি ৭৫ কিলোমিটার দূরের শিখদের পবিত্র স্থান কর্তারপুর গুরুদ্বারাও পানিতে তলিয়ে গেছে। পাকিস্তান অভিযোগ করেছে—ভারত উজানে বাঁধ থেকে অতিরিক্ত পানি ছাড়ছে। তবে ভারত বলেছে, তারা নিয়ম মেনে পানি ছেড়েছে।
পাকিস্তানের বাঁধ ও জলাধারগুলো ভরে যাওয়ায় আরো বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। বর্ষা এখনো শেষ হয়নি—তেমনি এর ধ্বংসযজ্ঞও শেষ হয়নি।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: