১৬ বছর পর এক ‘হাসান’ ও তাঁর প্রজন্মের গল্প

ফ্রান্সের স্কুলে কবি মতিউর রহমান মল্লিক

হাসান ইলিয়াস তানিম, ফ্রান্স | প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২৬ ০২:১১; আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২৬ ০৩:০১

কবি মতিউর রহমান মল্লিক

সময় কীভাবে যে ডানা মেলে উড়ে যায়! ভাবলে বুকটা এক অচেনা হাহাকারে ভরে ওঠে, গলাটা ধরে আসে, দুচোখে নেমে আসে স্মৃতির নোনা প্লাবন। ২০১০ সালের ১২ই আগস্ট (১লা রমজান) সেহরি শেষ করে ফজরের নামাযের প্রস্তুতি নিচ্ছি, ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা ভেঙে মোবাইলের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্দ্বীপন সাহিত্য পরিষদের জনপ্রিয় ‘নির্ঝর’ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক সুমন গাজী ভাইয়ের পাঠানো সেই হৃদয়বিদারক মেসেজ: "Motiur Rahman Mollik is no more with us... may Allah accept him as a resident of Jannah."
মেসেজটি পড়ার পর চোখের জল আর কোনো সীমানা মানেনি। সেদিন ফজরের সেজদায় পড়ে কীভাবে যে কেঁদেছিলাম, তা আজও ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য আমার নেই। সেজদা থেকে মাথা তুলতে পারছিলাম না, বুকের ভেতর জমাট বাঁধা কান্নাগুলো ডুকরে ডুকরে উঠছিল। বন্ধুরা পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ ১৬টি বছর পার হয়ে গেলেও বুকের ভেতর চেপে বসা সেই শোকের পাথরটা বিন্দুমাত্র হালকা হয়নি। সেই বিরহ বেদনার নীল শিখা আজও একইভাবে জ্বলে।
সেদিন ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকার পাতায় যখন কবিকে নিয়ে লেখা আমার প্রথম বিষাদমাখা স্মৃতিকথাটি ছাপা হলো, পত্রিকাটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে কতক্ষণ যে নিথর হয়ে বসে ছিলাম! দেখতে দেখতে মল্লিক ভাই আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন দীর্ঘ ১৬টি বসন্ত। সময়ের তোড়জোড়ে পৃথিবীর অনেক কিছুই বদলায়, মানুষের রঙ বদলায়, নদীর গতিপথ বদলায়; কিন্তু আমার হৃদয়ের গহীনে লালিত কবি মতিউর রহমান মল্লিকের অমর স্মৃতি এতটুকু ফিকে হয়নি। বরং এই ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এসে তাঁর না থাকার একাকীত্ব আর শূন্যতাটা বুকের খাঁচায় আরও তীব্রভাবে হাহাকার করে উঠছে।
প্রথম পরিচয়ের দিনটির কথা আজও আমার মানসপটে একেবারে জীবন্ত, যেন রূপকথার কোনো উজ্জ্বল চিত্রপট। ঢাকার এক গমগমে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ভিড়ে নিতান্তই এক অজপাড়াগাঁ থেকে আসা সাধারণ বালক হিসেবে তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। ব্যক্তিত্বের এক সুউচ্চ হিমালয়সম মানুষটির সামনে গিয়ে ভয়ে সংকোচে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। কিন্তু মল্লিক ভাই তো আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো ছিলেন না! মুখে তাঁর লেগেই থাকত সেই অমলিন, স্নিগ্ধ, পিতৃতুল্য হাসির ফোয়ারা। পরম মমতায় হাতটি ধরে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার নাম কি?" আমি কম্পিত কণ্ঠে বললাম, "ইলিয়াস হোসাইন।" তিনি এক স্বর্গীয় হাসি হেসে আমার হাতের ডায়েরিটি টেনে নিলেন, পরম স্নেহে কলম উঁচিয়ে লিখে দিলেন, "আজ থেকে তুমি শুধু হাসান ইলিয়াস। হাসান শব্দের অর্থ সুন্দর, সব মিলিয়ে অর্থ সুন্দর ইলিয়াস।" সেদিন শুধুই যে একটা নতুন নাম পেয়েছিলাম তা নয়; যেন এক দিশাহারা কিশোর তাঁর জীবনের আসল আলোকবর্তিকা খুঁজে পেয়েছিল!
আজ যখন এই স্মৃতিকথাটি লিখছি, ফ্রান্সের ঐতিহাসিক বাস্তিল চত্বরে বসে ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল দশটা। প্যারিসের এই শান্ত স্নিগ্ধ সকালে মল্লিক ভাইয়ের স্মৃতিগুলো আমায় বড্ড বেশি তাড়া করে ফিরছে। কবি মল্লিকের নিজের হাতে গড়ে দেওয়া এক 'হাসান' আজ একা নয়; সে এক প্রজন্ম থেকে অপর প্রজন্মে ভালোবাসার শুভ্র আলো ছড়িয়ে চলেছে। মল্লিক ভাইয়ের দেওয়া সেই ভালোবাসার নাম ও স্নেহের উত্তরাধিকার শুধু আমার জীবনের গণ্ডিতে থমকে থাকেনি; তা এক অলৌকিক সুতোর মতো জড়িয়ে গেছে আমার রক্তে, আমার পরবর্তী প্রজন্মের ধমনীতে।
আজ সুদূর ফ্রান্সে আমার সন্তানরা প্যারিসের পাবলিক স্কুলে পড়ালেখা করে। তাদের নামের শুরুতে মল্লিক ভাইয়ের হৃদয়ে আঁকা সেই পরম ভালোবাসার 'হাসান' পদবী আজ সগর্বে উজ্জ্বল আফিফা হাসান জারা, সরদার হাসান মাহমুদ আরাফ। প্রতিদিন সকালে ফ্রান্সে যখন আমার সন্তানরা তাদের শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করে, ফরাসি শিক্ষকরা যখন রোল ডাকার সময় ওদের 'হাসান' নামে ডেকে ওঠেন, তখন বুকের ভেতর এক গভীর আবেগ আর স্মৃতিকাতরতার নোনা ঢেউ খেলে যায়। চোখে জল চলে আসে পরম অনুভূতিতে। মনে হয়, আমার প্রিয় মল্লিক ভাই বুঝি সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর নাম, তাঁর দোয়া আর ভালোবাসার এক অদৃশ্য চাদর দিয়ে তিনি আজও সুদূর ফ্রান্সে আমার ছোট ছোট সন্তানদের পরম স্নেহে আগলে রেখেছেন। এ কেবল একটি নাম নয়, এ যে কবি মল্লিকের অমর ভালোবাসার এক জীবন্ত উত্তরাধিকার, যা ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে আজ ফরাসি স্কুলের শ্রেণীকক্ষে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে!
একজন মানুষকে কতটা গভীরভাবে ভালোবাসলে, কতটা নিঃশ্বাসে বিশ্বাসে ধারণ করলে নিজের চেনা ঘরবাড়ি ছেড়ে স্রেফ তাঁর এক পলক সান্নিধ্য পাওয়ার টানে ঢাকায় চলে আসা যায়, তা কেবল মল্লিক ভাইয়ের প্রেমে পড়া মানুষগুলোই বুঝবে। পরবর্তী তিনটি বছর ছায়ার মতো তাঁর পাশে পাশে থেকে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেই তিনটি বছর আমার জীবনের সবচেয়ে বড় রত্নভাণ্ডার। তিনি শুধু বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সফল কর্ণধারই ছিলেন না, ছিলেন আমার মতো হাজারো পথভোলা তরুণের স্বপ্নের কারিগর, হৃদয়ের পরম অভিভাবক।
২০০৮ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারির কথা ভাবলে আজও আমার চোখ ভিজে ওঠে। সাতক্ষীরায় এক প্রোগ্রামে এসে ফোনটা করেই সেই নিজস্ব ভঙ্গির খুনসুটি শুরু করলেন, "এই হাসান, তোমাকে কতবার না বলেছি তোমাদের বাসায় যাব, কিন্তু দাওয়াত তো দিলে না!" তারপরই আবার সেই মিষ্টি অধিকারের নির্দেশ, "শোন, আম্মুকে বলবা আমি কিন্তু রাতে আসছি, সাথে চিংড়ি মাছের কোরমা করতে যেন একদম না ভোলেন!"
সেই অবিস্মরণীয় রাতে আমাদের সাধারণ ঘরের টিনের চালের নিচে তিনি যখন এসে পা রাখলেন, সাথে ছিলেন টাইফুনের কালজয়ী “শ্রাবণের বিপ্লব” গানের সুরকার, প্রখ্যাত শিল্পী মাহফুজ বিল্লাহ শাহী ভাই। সে রাতের কথা আমি কোনোদিন ভুলব না। ঘরের উঠোনে বসে রাতভর গান, সুরের জাদুকরী মূর্ছনা, সাইমুম প্রতিষ্ঠার সেই সংগ্রামের ইতিহাস, আর দেশ বিদেশের কোল জুড়ে ইসলামী সংস্কৃতির শুভ্র সুবাস ছড়িয়ে দেওয়ার অদম্য স্বপ্নের কথন... আজও রাতের নীরবতায় কান পাতলে মনে হয় সেই রাতজাগা সুরগুলো আমার ঘরের কোণে প্রতিধ্বনি তুলছে। মাহফুজ বিল্লাহ শাহী ভাই সেদিন আমার পিঠ চাপড়ে একটি কথা বলেছিলেন, যা আজও আমার কানে বাজে। তিনি স্নেহের সুরে বলেছিলেন, "হাসান, একদিন কিন্তু মল্লিক ভাইয়ের স্মৃতি জানার জন্য মানুষ তোমাকেই খুঁজবে!" শাহী ভাইয়ের সেই কথা আজ ১৬টি বছর পর প্রবাসের মাটিতে বসে শতভাগ সত্যি বলে মনে হয়; আজ মল্লিক ভাইয়ের প্রতিটি স্মৃতি আমার কাছে এক পরম আমানত।
মল্লিক ভাই ছিলেন মানুষ গড়ার এক অলৌকিক কারিগর। নিজের ভেতরের সবটুকু আলো দিয়ে অন্যকে কীভাবে আলোকিত করতে হয়, তা তিনি ছাড়া আর কেউ জানত না। তিনি প্রায়ই আমার চোখে চোখ রেখে বলতেন, "হাসান, তোমাকে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতেই হবে। আমি তোমাকে 'ডক্টর হাসান ইলিয়াস' বলে ডাকতে চাই।" আমার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার আগে আমার আত্মবিশ্বাস যোগাতে পরম স্নেহে একটি ছড়া লিখে উপহার দিয়েছিলেন। জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি লড়াইয়ে তাঁর সেই লাইনগুলো আমার বুকের ভেতর তুরুপের তাস হয়ে বাজে:
"হাসানের পরীক্ষা সামনে
বেশি করে আল্লাহর নাম নে
খোদা যেন ওর বুকে বল দেন
পায় যেন এ প্লাস গোল্ডেন..."
পরবর্তী জীবনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের সহ সভাপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করা কিংবা আজকের এই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পথচলা সবকিছুর নেপথ্যেই ছিল এই মহান মানুষটির নিঃস্বার্থ দোয়া, বুকভরা ভালোবাসা আর দিকনির্দেশনা। আজ বড় বেশি ইচ্ছে করে সুদূর পরবাস থেকে আকাশপানে তাকিয়ে চিৎকার করে বলি, "মল্লিক ভাই, আপনি যেখানেই থাকুন দেখুন! আপনার অসমাপ্ত সাংস্কৃতিক বিপ্লব আজ আপনার কর্মীরা ছড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে।"
আজ ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে যখন ভোরের আলো ফোটে, প্রবাসের আকাশে মেঘ জমে, বুকের ভেতরটা বড় শূন্য লাগে, বড্ড খালি লাগে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আজীবন লড়ে যাওয়া আমাদের এই শীতল বটবৃক্ষ আজ আর সশরীরে নেই। কিন্তু তিনি কি সত্যিই হারিয়ে গেছেন?
না, যিনি কোটি মানুষের হৃদয়ে আলো আর ভালোবাসার বীজ বুনে দিয়ে গেছেন, তিনি কখনো হারান না, হারিয়ে যেতে পারেন না! কিয়ামতের ময়দানে রাব্বুল আলামীনের সামনে দাঁড়ানোর যে আত্মবিশ্বাসী ও বুকচেরা আকুতি তিনি জানাতেন, তা আজও আমাদের ঘুম ভেঙে জাগিয়ে তোলে “হে আল্লাহ, তোমার দেয়া দায়িত্ব আমি সাধ্যমতো পালন করার চেষ্টা করেছি...”
আমার প্রিয় মল্লিক ভাই, আপনাকে ছাড়া ১৬টি দীর্ঘ বিরহ বসন্ত কেটে গেল। আজ এই অশ্রুসিক্ত দিনে দাঁড়িয়ে বুকের রক্ত দিয়ে আবারও প্রতিজ্ঞা করছি, যে সবুজ ভূখণ্ডে আপনি সুসংস্কৃতির সুন্দর বীজ রোপণ করে গেছেন, তাকে আমরা কখনো শুকিয়ে যেতে দেব না। আপনার সেই অসমাপ্ত স্বপ্নকে দিগন্ত থেকে নীল দিগন্তে ছড়িয়ে দেওয়ার লড়াইয়ে আমরা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত হেঁটে চলব।
আল্লাহর দরবারে একটাই আকুল মিনতি, রাব্বুল আলামীন যেন আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদায় মেহমান হিসেবে কবুল করেন। মল্লিক ভাই, আপনি আমার হৃদয়ে ছিলেন, আজও আছেন, এবং আমার ও আমার সন্তানদের ধমনীর প্রতিটা স্পন্দনে চিরকাল এক ভালোবাসার নাম হয়ে বেঁচে থাকবেন।

লেখক: সাবেক সহ সভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব এবং গ্লোবাল কমিউনিটির সদস্য, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ফ্রান্স।



বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top