হিমাগার ভাড়া কমানোর দাবি
ব্যবসায়ীদের আন্দোলনে রাজশাহীতে আলু বেচাকেনা বন্ধ
নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২৬ ১৪:৩৪; আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ ১৬:০২
রাজশাহীতে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া কমানোর দাবিতে হিমাগার থেকে আলু বেচাকেনা বন্ধ রেখেছেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। ভাড়া পুনর্নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা হিমাগার থেকে আলু বের করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কর্মসূচির প্রথম দিনে জেলার বিভিন্ন হিমাগারে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, হিমাগারের প্রকৃত খরচ বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা হোক। এই ভাড়া না কমালে তাঁদের উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচ আরও বেড়ে যাবে। এতে আলুচাষি, ব্যবসায়ী এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে হিমাগার মালিকদের দাবি, বিদ্যুৎ, শ্রমিক ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সরেজমিনে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকালে রাজশাহীর পবা উপজেলার সরকার কোল্ড স্টোরেজে গিয়ে দেখা যায়, হিমাগার থেকে আলু বের করার কোনো কার্যক্রম নেই। একই অবস্থা দেখা যায় পাশের উত্তরা কোল্ড স্টোরেজেও। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এসব হিমাগারের সামনে আলু কেনাবেচা, লোড-আনলোড ও পরিবহনের ব্যস্ততা থাকে। কিন্তু আন্দোলনের কারণে সকাল থেকে হিমাগারগুলোর সামনে ছিল স্থবির পরিবেশ। আলুচাষিদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি আগের দিন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই কর্মসূচি ঘোষণা করে। সংগঠনটির নেতারা জানান, হিমাগারের ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আলু বেচাকেনা বন্ধ রাখবেন।
এবিষয়ে রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী শাহ বলেন, এক বস্তা আলু হিমাগারে রাখতে মালিকপক্ষের সর্বোচ্চ খরচ হয় ১০০ টাকা। কিন্তু চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৪৭৫ টাকা। এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তিনি আরও বলেন, “এর আগে হিমাগার ভাড়া অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তখন দেশের পরিস্থিতির কারণে সুশীল সমাজ, আর্মি ও রাজনৈতিক নেতারা আমাদের শান্ত থাকার অনুরোধ করেছিলেন। বলা হয়েছিল, রাজনৈতিক সরকার এলে বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।” তিনি জানান, গত ১৯ এপ্রিল তাঁরা বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছেন। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে তিন থেকে চারবার বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসায় সংগঠনের বিভিন্ন ইউনিট হিমাগার থেকে আলু বেচাকেনা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, “রাজশাহী জেলায় ৩৬টি হিমাগার রয়েছে। প্রতিদিন যদি একটি হিমাগার থেকে এক হাজার বস্তা আলু বের হয়, তাহলে দিনে ৩৬ হাজার বস্তা আলু বাজারে যাওয়ার কথা। কিন্তু আন্দোলনের কারণে সেই সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ভাড়া পুনর্নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন থেকে সরে আসব না।”
আলুচাষি হারুন বলেন, স্টোর ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে তাঁরা সকাল থেকেই বিভিন্ন হিমাগারে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের একমাত্র দাবি, অবিলম্বে হিমাগারের ভাড়া কমাতে হবে। ভাড়া পুনর্নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা কোনো ধরনের আলু বেচাকেনায় অংশ নেবেন না। কৃষক হারুন বলেন, “স্টোর ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এতে চাষি ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। আমরা চাই যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা হোক। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।”
এ বিষয়ে রাজশাহীর আসমা কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য খন্দকার আউলিয়া রাজিব ওয়াহিদ বলেন, “গত বছর ভাড়া বৃদ্ধি হলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নামেন। তখন সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে তাঁদের অনেক ছাড় দিয়ে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন আবার তাঁরা ভাড়া কমানোর দাবি করছেন। এ কারণে তাঁরা আলু বের করছেন না। তবে বিদ্যুৎ, শ্রমিক ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া যৌক্তিকভাবেই বৃদ্ধি করা হয়েছিল।”
আন্দোলনের কারণে জেলার আলু বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় হিমাগার থেকে আলু বের না হলে বাজারে সরবরাহ কমতে পারে। এতে পাইকারি ও খুচরা বাজারে আলুর দামে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।এদিকে রাজশাহী জেলা মার্কেটিং অফিসার সানোয়ার হোসেন বলেন, “একটি ব্যবসায়ী সমিতি এই আন্দোলন করছে। তারা সরকারি প্রজ্ঞাপনের নির্ধারিত মূল্যে আলু রাখতে চায় না। তারা কম ভাড়া দিতে চায়। এ দাবি নিয়ে তারা আমার কাছে এসেছিল। আমি তাদের বুঝিয়ে বলেছি, সরকার এখনো এই মৌসুমের জন্য আলুর মূল্য নির্ধারণ করে দেয়নি। তাই এ বিষয়ে আমার কিছু বলার সুযোগ নেই।” তিনি আরও বলেন, আলুর দাম নির্ধারিত থাকলে সমন্বয়ের চেষ্টা করা যেত। কিন্তু বাজার অর্থনীতিতে কে বেচাকেনা করবে বা করবে না, সেটি প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: