রাজশাহীতে জমে উঠেছে আমের বাজার,দাম নিয়ে হতাশা
রাজশাহীতে তীব্র গরমে একসঙ্গে পাকছে আম ॥ বিপাকে চাষিরা
শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন | প্রকাশিত: ৯ জুন ২০২৬ ১৫:২২; আপডেট: ৯ জুন ২০২৬ ১৫:২৬
মধুমাসে গুটি আমের কেনাবেচা শেষ হয়ে এখন বাজারে রাজত্ব করছে গোপালভোগ, ক্ষিরসাপাত (হিমসাগর) আর লখনার মতো জনপ্রিয় জাতের আম। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা ছুটে আসছেন রাজশাহীর আমের মোকামগুলোতে। তবে তীব্র গরমে একসঙ্গে পাকছে আম। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। অপর দিকে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় হতাশ বাগান মালিকসহ ব্যবসায়ীরা।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন। সংশ্লিষ্টদের আশা, এ মৌসুমে শুধু রাজশাহীতেই প্রায় ৮’শ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার আম বাণিজ্য হবে। আর রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কঠোর নজরদারির কারণে রাজশাহীতে শতভাগ নিরাপদ ও রাসায়নিকমুক্ত আম বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে।
স্থানীয় বাগান মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, খরার কারণে অনেক গুটি ঝরে গেলেও নিয়মিত সেচ দেওয়ায় ভালো ফলন পেয়েছেন। তবে বাজারে গুটি আমের চাহিদা নেই বললেই চলে। বর্তমানে গুটি আম বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৮’শ থেকে ১ হাজার টাকায়। তিনি জানান, প্রতিটি গাছে কীটনাশক ও সেচ বাবদ দেড় থেকে দুই হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ১৫০ গাছের বাগান তিন বছরের জন্য লিজ নিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে। আরেক ব্যবসায়ী বলেন, “ঈদের ছুটির কারণে হাটে ক্রেতা ও বাইরের ব্যাপারীর সংখ্যা অনেক কম ছিলো। এখন ক্রেতাদের সমাগম বাড়ছে।
চাষি ও ব্যবসায়ীদের মতে, এ বছর তীব্র গরমের কারণে বিভিন্ন জাতের আম প্রায় একই সময়ে পাকতে শুরু করেছে। ফলে বাজারে সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে গেছে। সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় দাম পড়ে গেছে। বানেশ্বর বাজারের আড়তদার মনিরুল ইসলাম মানিক বলেন, “প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ট্রাক আম কিনে আড়তে রাখছি। কিন্তু বেচাকেনা আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। পাইকাররা কম অর্ডার দেয়ায় বাজারে দামও কম।”
চাষি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কম দামে আম পেয়ে সন্তুষ্ট সাধারণ ক্রেতারা। ক্রেতা প্রাঞ্জল ও কামরুল জানান, গত বছর উৎপাদন কম থাকায় আমের দাম ছিল অনেক বেশি। এবার দাম সহনীয় হওয়ায় পরিবারের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনদের জন্যও আম কেনা সম্ভব হচ্ছে।
বর্তমানে বানেশ্বর হাটে গোপালভোগ আম মণপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় এবং ক্ষিরসাপাত আম ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত মৌসুমে একই আমের দাম প্রায় এক হাজার টাকা বেশি ছিল।
এবার রাজশাহী মহানগরীতেও দেখা যাচ্ছে নতুন চিত্র। বড় বাজারের বাইরে পাড়া-মহল্লায় ভ্যান ও অস্থায়ী দোকানে সরাসরি আম বিক্রি করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। এতে সাধারণ মানুষ বাসার কাছেই সহজে আম কিনতে পারছেন। বর্তমানে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খির্সাপাত আম প্রতি কেজি ৫০ টাকা, গোপালভোগ ৪০ টাকা এবং রানি আম ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বেশি পরিমাণে কিনলে আরও কম দামে পাওয়া যাচ্ছে।
হাটের ইজারাদারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমের শুরুতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকার আম কেনাবেচা হচ্ছে। পূর্ণ মৌসুমে এ লেনদেন প্রতিদিন এক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। আমকে কেন্দ্র করে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কেউ আম সংগ্রহ, ঝুড়ি ও ক্যারেট প্রস্তুত, পরিবহন কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসে কাজ করছেন। রাজশাহীর অর্থনীতির একটি বড় অংশই মৌসুমি আম বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: