নওগাঁয় শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের বিচার দাবিতে অভিভাবকদের বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিনিধি: | প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬ ২১:৪৯; আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ ২১:৫২

ছবি: সংগৃহীত

নওগাঁ সদর উপজেলার নারচী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালে চতুর্থ শ্রেণির ১৭ শিক্ষার্থীকে বৈদ্যুতিক ডিস সংযোগের তার দিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যায় বিদ্যালয়সংলগ্ন নারচী মোড়ে বিক্ষোভ করেন অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।

স্থানীয় সূত্র, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুধবার পাঠদান চলাকালে চতুর্থ শ্রেণির একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথাবার্তার একপর্যায়ে হাসান নামে এক শিক্ষার্থীকে একটি গান গাইতে বলা হয়। সে গান গাওয়া শুরু করলে সহকারী শিক্ষক আব্দুস সালাম শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ডিস সংযোগের বৈদ্যুতিক তার দিয়ে একের পর এক শিক্ষার্থীকে মারধর করেন। এতে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত ২৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্তত ১৭ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে ছেলে ও মেয়ে—উভয় শিক্ষার্থী রয়েছে। অনেকের শরীর, হাত ও পিঠে আঘাতের দাগ দেখা গেছে বলে দাবি করেছেন অভিভাবকরা।

ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং বাড়ি ফিরে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানায়। পরে খবরটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সন্ধ্যায় তারা বিদ্যালয়সংলগ্ন নারচী মোড়ে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় তারা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী হাসান বলে, "আমাদের ক্লাস চলছিল। তখন আমাকে 'স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনা বাঁশ খাইছে' এই গান বলতে বলা হয়। আমি গান বলা শুরু করলে সালাম স্যার হঠাৎ রেগে ক্লাসে এসে ডিসের তার দিয়ে আমাদের মারধর করেন। আমরা কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবাইকে মারতে শুরু করেন।"

আরেক শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ বলে, "স্যার খুব জোরে তার দিয়ে মারছিলেন। আমার হাত, পিঠ ও পায়ে আঘাত লেগেছে। আমরা ভয়ে কান্না করছিলাম, কিন্তু তারপরও মারধর বন্ধ করেননি।"

শামিমা নামে এক শিক্ষার্থী বলে, "আমরা খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। স্যার সবাইকে দাঁড় করিয়ে একে একে মারেন। বাড়ি গিয়ে মাকে সব বলেছি। এখনো শরীরে ব্যথা করছে।"

অভিভাবকদের অভিযোগ, একটি সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে এতগুলো কোমলমতি শিশুর ওপর এমন নির্মম আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

অভিভাবক জুয়েল বলেন, "আমরা সন্তানদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য বিদ্যালয়ে পাঠাই, নির্যাতনের জন্য নয়। যারা শিশুদের ওপর এভাবে নির্যাতন করে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রশাসনের কাছে আমরা নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার চাই।"

আরেক অভিভাবক বলেন, "আজ আমাদের সন্তানরা মারধরের শিকার হয়েছে, কাল অন্য কারও সন্তান হতে পারে। তাই বিষয়টি আপসের মাধ্যমে নয়, আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। ভবিষ্যতে যেন কোনো শিক্ষক এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সাহস না পান, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।"

এ বিষয়ে অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক আব্দুস সালাম বলেন, "ঘটনাটি ঘটেছে। আমি শিক্ষার্থীদের মারধরের বিষয়টি স্বীকার করছি। এ ঘটনার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী। বিষয়টি নিয়ে অভিভাবক ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করবো।"

তবে অভিভাবকদের একটি বড় অংশের দাবি, শুধু ক্ষমা চাওয়ায় বিষয়টির সমাধান হবে না। শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ ঘটনায় পুরো এলাকায় আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অভিভাবক ও স্থানীয়দের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপদ ও ভয়মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।



বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top