রাবিতে অ্যাকাডেমিক সাফল্যে পুরুষদের চেয়ে এগিয়ে নারী শিক্ষার্থীরা

রাবি প্রতিনিধি: | প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২৬ ১৬:০৪; আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ ১৭:০৫

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় একসময় নারীদের উপস্থিতি ছিল সীমিত। তবে এখন ভর্তি থেকে শুরু করে সিজিপিএ, গবেষণা, বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—প্রায় সব ক্ষেত্রেই নিজেদের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন নারী শিক্ষার্থীরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সাম্প্রতিক অ্যাকাডেমিক পরিসংখ্যানেও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা গেছে। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের প্রথম ডিনস অ্যাওয়ার্ডে সেরা ১০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯ জনই নারী। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৯টি বিভাগ ও ৬টি ইনস্টিটিউটের মধ্যে প্রায় ৪১টিতে নারী শিক্ষার্থীদের গড় সিজিপিএ পুরুষ শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি।

শিক্ষাবিদদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিত অধ্যয়ন, নিয়মিত অ্যাকাডেমিক চর্চা এবং শিক্ষার প্রতি নারীদের ক্রমবর্ধমান মনোযোগের ফল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে এই সাফল্য যতটা দৃশ্যমান, কর্মক্ষেত্রে তার প্রতিফলন এখনো ততটা দেখা যায় না।

ডিনস অ্যাওয়ার্ডেও নারীদের আধিপত্য

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, একসময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিষয়ে পুরুষ শিক্ষার্থীরা এগিয়ে থাকলেও এখন সেই চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। সামাজিক বিজ্ঞান, কলা ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের পাশাপাশি বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান এবং বিভিন্ন পেশাভিত্তিক বিভাগেও মেয়েরা ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করছেন। অনেক বিভাগেই প্রথম শ্রেণি, সর্বোচ্চ সিজিপিএ এবং ডিনস অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্তদের তালিকায় নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই বেশি।

গত ২৩ এপ্রিল সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের প্রথম ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। সেখানে সেরা ১০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯ জনই নারী। তারা হলেন—অর্থনীতি বিভাগের নাফিসা ইয়াসমিন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বর্ষা রাণী মণ্ডল, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সানজিদা ফারজানা, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের রিফাহ রাফিয়া বারী, ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের রাজিয়া সুলতানা পারুল, লোক প্রশাসন বিভাগের মমতাজ ফারজানা তিথি, নৃবিজ্ঞান বিভাগের জান্নাতুল মাওয়া শিন, ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের তৃষা দাশ এবং সমাজকর্ম বিভাগের অন্তরা। একমাত্র পুরুষ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের আশরাফুল খান ফয়সাল ডিনস অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।

শুধু ডিনস অ্যাওয়ার্ডেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক ফলাফল বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, অধিকাংশ বিভাগে গড় সিজিপিএর দিক থেকেও নারী শিক্ষার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন।

কেন এগিয়ে যাচ্ছেন নারী শিক্ষার্থীরা

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতে, এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে পরিকল্পিত পড়াশোনা, সময়ানুবর্তিতা এবং ধারাবাহিক অ্যাকাডেমিক চর্চা।

শিক্ষকদের মতে, নারী শিক্ষার্থীরা অধিকাংশ সময় নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকেন এবং পুরো সেমিস্টারজুড়ে ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনা করেন। পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতির পাশাপাশি তারা অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, টার্ম পেপার ও ক্লাস পারফরম্যান্সেও সমান গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি পরিবারের ইতিবাচক মনোভাব এবং সমাজে নারীদের শিক্ষার গুরুত্ব বৃদ্ধির ফলে উচ্চশিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ ও আগ্রহ বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা, অনলাইন শিক্ষা উপকরণ এবং গবেষণার সুযোগও তাদের দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

তাদের মতে, নারী শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে তুলনামূলক বেশি সচেতন। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি, নোট প্রস্তুত, শিক্ষকদের সঙ্গে একাডেমিক যোগাযোগ এবং সময়মতো অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার প্রবণতা তাদের ফলাফলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে অনেক পুরুষ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে চাকরির প্রস্তুতি, ব্যবসা, রাজনীতি কিংবা অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমে তুলনামূলক বেশি সময় ব্যয় করায় অ্যাকাডেমিক ফলাফলে কিছুটা পিছিয়ে পড়ছেন বলে শিক্ষকদের পর্যবেক্ষণ।

ডিনস অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মমতাজ ফারজানা তিথি বলেন, এ অর্জন তাকে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা দেবে। এর পেছনে শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা, পরিবারের সমর্থন এবং নিয়মিত অধ্যয়নের বড় ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে নারী শিক্ষার্থীরা শুধু ভালো ফল নয়, গবেষণা, প্রশাসন ও বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রেও নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, সময়ানুবর্তিতা, পরিকল্পিত পড়াশোনা, শেখার আগ্রহ এবং আত্মনির্ভর হওয়ার মানসিকতা নারীদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়ায় তারা দক্ষতা বিকাশের আরও সুযোগ পাচ্ছেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ডিনস অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী বর্ষা রাণী মণ্ডল বলেন, নিয়মিত ক্লাস, পরিকল্পিত পড়াশোনা এবং শিক্ষকদের সহযোগিতাই এ অর্জনের মূল ভিত্তি। সুযোগ পেলে মেয়েরা যে কোনো ক্ষেত্রেই নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে। এই স্বীকৃতি আমাদের আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।

অ্যাকাডেমিক সাফল্যের পরও কর্মক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ

শিক্ষাবিদদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ফল করলেও কর্মক্ষেত্রে সেই সাফল্যের প্রতিফলন সবসময় সমানভাবে দেখা যায় না। বাংলাদেশে নারীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ ও অ্যাকাডেমিক সাফল্য বাড়লেও শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ, গবেষণায় নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব এবং উচ্চপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক সাফল্যকে বাস্তব কর্মজীবনের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদ বলেন, “বর্তমান প্রজন্মের নারী শিক্ষার্থীরা অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষতার নতুন মানদণ্ড তৈরি করছে। ডিনস অ্যাওয়ার্ড কিংবা সিজিপিএ—এসব অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও ইতিবাচক অ্যাকাডেমিক সংস্কৃতিরও প্রতিফলন।”

উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, “ডিনস অ্যাওয়ার্ডে নারী শিক্ষার্থীদের এই সাফল্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন। আমাদের শিক্ষার্থীরা মেধা, অধ্যবসায় ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে, আর নারী শিক্ষার্থীরা সেই ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। আমি বিশ্বাস করি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে দেশের জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”



বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top