ফের তাল প্রকল্প: গাছ কার ভাগে?

রাজ টাইমস | প্রকাশিত: ৩ অক্টোবর ২০২১ ০২:০২; আপডেট: ৩ অক্টোবর ২০২১ ০২:০৬

মোস্তফা কামাল

আবারও তালগাছ প্রকল্প। বজ্রপাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পটিতে তালগাছ ছাড়াও রয়েছে অ্যালার্মিং সিস্টেম, হাওর ও ফাঁকা জায়গায় ছাউনি তৈরি এবং জনসাধারণকে সচেতন করা। এর আগে, কাবিখা-টিআর প্রকল্পের আওতায় লাখ দশেক তালগাছের চারা-আঁটি লাগানোর পেছনে খরচ গেছে প্রায় শত কোটি টাকা। প্রায় পুরোটাই গচ্ছা গেছে। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছিল সেই তালগাছগুলো ‘নাই’ করে ফেলার রহস্য উদঘাটনে। কুলাতে পারেনি। ‘নাই’ হয়ে কোথায় গেছে এগুলো, হদিস মেলেনি।

বিভিন্ন জায়গায় বীজসহ লাগানো তালের চারাগুলো চলে গেছে গরু-ছাগলের পেটে।

এবারের প্রকল্পে বজ্রপাতপ্রবণ হিসেবে শনাক্ত করা ২৩ জেলায় এক হাজার ছাউনি তৈরি করা হবে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের কোনও এলাকায় বজ্রপাতের শঙ্কা দেখা দিলেই ওই এলাকাবাসীর মোবাইল ফোনে অন্তত ৪০ মিনিট আগে মেসেজ চলে যাবে। তাদের জানানো হবে কখন, কোন জায়গায় বজ্রপাত হবে?

এককথায় চমৎকার প্রকল্প। মন্ত্রণালয়ের জোগাড় করা তথ্য বলছে, চলতি বছর ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে ২৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪২, ময়মনসিংহে ৩০, চট্টগ্রামে ২৩, সিলেটে ২৫, রংপুরে ২৭, রাজশাহীতে ১০৪, বরিশালে ১০ ও খুলনায় ২১ জন। বজ্রপাতে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি রাজশাহী বিভাগে। পরিসংখ্যান বলছে, এর আগে ২০২০ সালে মারা গেছে ২৪৭ জন। ২০১৯ সালে ১৯৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৭ সালে ৩০৭ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন।

বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। দেশটির একদিকে বঙ্গোপসাগর, এরপরই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে গরম আর আর্দ্র বাতাস আসছে। আবার উত্তরে পাহাড়ি এলাকা। কিছু দূরেই হিমালয়। সেখান থেকে ঢুকছে ঠান্ডা বাতাস।

ঠান্ডা-গরম এই দুই বাতাসের যোগফলে বজ্রপাত। বজ্রপাত নিয়ে কাজ করা গবেষকরা বলছেন, এর পেছনেও রয়েছে প্রকৃতির গতিতে বাধা দেওয়ার জের। দেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছে এখন মোবাইল ফোন আছে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় মোবাইল ফোন ও বৈদ্যুতিক টাওয়ার রয়েছে। কৃষিতেও যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। তাছাড়া, সন্ধ্যার পরে মানুষের ঘরের বাইরে অবস্থান বাড়ছে। আর বেশিরভাগ বজ্রপাতই হয় সন্ধ্যার দিকে। আবহাওয়াবিদ বা বিশেষজ্ঞদের কাছে বজ্রপাত ঠেকানোর দাওয়াই নেই। আছে সতর্কতার নির্দেশনা।

এগুলোর মধ্যে রয়েছে, বজ্রঝড়ের সময় ঘরের বাইরে না যাওয়া, জরুরি দরকারে বের হলে পায়ে রাবারের জুতা পরা, বজ্রপাতের সময় ধানক্ষেত বা খোলামাঠে থাকলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসে পড়া, বজ্রপাতের শঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত ভবন বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া, ভবনের ছাদ বা উঁচু ভূমিতে না যাওয়া, গাড়ির ভেতর থাকলে গাড়ির ধাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ না রাখা ইত্যাদি।

সেই আদিকাল থেকেই তালগাছকে বজ্রপাত রোধের প্রাকৃতিক দাওয়াই মনে করা হয়। কিন্তু, তালসহ বড় বড় গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। নীতি-নৈতিকতার খরার মধ্যে প্রকৃতির প্রতি অবিচারও কম হচ্ছে না। এর জেরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রকৃতিতে মানুষের অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপ, নদীশাসন প্রভৃতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা প্রভাবজনিত কারণে বাংলাদেশের বিপদাপন্ন হওয়ার শঙ্কা কেবল বাড়ছে। আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হয়ে আসছে। এসব ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী ঝড়, টর্নেডো, নদীভাঙন, উপকূল ভাঙন, খরা, শৈত্যপ্রবাহ প্রভৃতি। এছাড়া সিসমিক জোন অর্থাৎ ইউরেশিয়ান প্লেট, ইন্ডিয়ান প্লেট ও বার্মা প্লেটের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকার কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। রয়েছে, পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন একটি বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও তীব্রতা দিন দিন শুধু বাড়ছে। আবহাওয়া ও পরিবেশ বিপর্যয়ের জেরে দেশে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়বে, এমন আভাস দেওয়া হচ্ছিল অনেক দিন থেকেই। তবে, হাল দুনিয়ায় বিভিন্ন দেশ অ্যালার্মিং সিস্টেম ও বজ্র নিরোধক দণ্ড ব্যবহার করে হতাহতের সংখ্যা কমাতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশেও সেই সিস্টেমটির দিকে এগিয়ে থেমে গেছে কয়েকবার।

গত বছর স্থাপিত ৮টি লাইটনিং ডিটেক্টর অচল হয়ে গেছে। যে কারণে বজ্রপাত প্রশ্নে তালগাছ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এ গাছটির দানের ক্ষমতা অনেক। একপায়ে দাঁড়ানো তালগাছ নিরপেক্ষতার সঙ্গে শুধু দেয়, নেয় না। কারো কাছে কিছু চায় না। আমাদের শিল্প-সাহিত্যেও তালগাছের খুব গুরুত্ব। তাল এবং তালগাছ নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকুমার রায়ের রয়েছে অনেক লেখা।

তালগাছে পরিশ্রম ও ঐক্যের প্রতীক বাবুই পাখির ঝুলন্ত মনোরম বাসা রাজনীতি, অর্থনীতি, গণতন্ত্রসহ কত কিছুর উপমা। অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য তালগাছের মাথায় বাস করা কানাবগির ছায়ের তুলনাও আমাদের যাপিত জীবনে কম নয়। তালগাছের ওই বগিটা পানতা ভাত চায় না, পুঁটি মাছও খায় না। ফল হিসেবে তাল অন্তঃসারশূন্য ইতিহাস হয়ে গেলেও বজ্রপাত ও ঝড় মোকাবিলায় গাছটির আবেদন সর্বকালেই। বাঙালি দর্শন ও সংস্কৃতিতে তালগাছের মতো ব্যবহার আর কোনও গাছের নেই। অথচ তালগাছ সচরাচর কেউ লাগাতে চান না। লাগালেও যতœ-আত্তি করার কেউ থাকে না। তবে, ডাঙর হওয়ার পর গাছটা হয়ে যায় অ্যাজমালি সম্পদ। তখন তালের হকদার আশপাশের সবাই। মওকা মতো নিজের মনে করে চুপচাপে তালটা নিয়ে সোজা ঘরে চলে যায়। তালের ভাগ কেউ ছাড়েন না। বিচার মানলেও ভাগে তালগাছটা চান সবাই। উল্টা বাস্তবতাও আছে। পজিশনঅলা গৃহস্থের তালগাছের আশপাশেও ঘেঁষার সাহস করে না কেউ। এমনকি তার বাড়ির পাশে তাল পড়লে তা কুড়িয়ে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আস্থা হাছিলের প্রতিযোগিতায় নামে অপজিশনের বহু খাদেমও। গুচ্ছমূলী বৃহৎ অশাখা এই বৃক্ষটি হায়াত পায় দেড়শ বছর পর্যন্ত। রোগবালাইও কম। বাড়েও বুঝে-শুনে, ধীরে, শিনা টান করে। তালগাছের চরিত্র-বৈশিষ্ট্যে কোনও গোলমাল নেই। কারো পক্ষে-বিপক্ষে যায় না। সাইকাস প্রজাতির শক্ত মেরুদণ্ডী এ উদ্ভিদটি হয় পুরুষ, নইলে স্ত্রী। মোটেই উভয় লিঙ্গ হয় না। ফুল-ফলেও একই ঘ্রাণ।

তাল যথানিয়মে পাকার পর ঝরে পড়ে যথাসময়েই। তালের আঁশ এবং ছালবাকলার ইউটিলিটিও অনেক। কষ্টসহিষ্ণু ও শাখা-প্রশাখা না থাকায় আশপাশের জমির ফসলের ক্ষতি করে না। শক্ত মজবুত গভীরমূলী বলে ঝড়-তুফান, টর্নেডো, বাতাস প্রতিরোধ ও মাটি ক্ষয় রোধে তালের গাছের ভূমিকা অতুলনীয়। তাল কাঠ পোকায় খায় না। পোকামাকড়রা তালকাঠে বসারও সাহস পায় না। তালগাছ বজ্রপাতের আক্রমণ রুখতে পারে এমন একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রচলিত আছে গাঁওগেরামে। অধিকাংশ মানুষ তালগাছ লাগিয়ে এর ফল খেয়ে যেতে পারেন না। তার ফল-সুফল নেয় পরবর্তী প্রজন্ম। আবার বেশিরভাগ মানুষ মধ্য কিংবা শেষ বয়সে এসে তালগাছ লাগাতে পছন্দ করেন। যে কারণে জীবদ্দশায় তালগাছ মারা যাওয়ার ঘটনা কেউ কোনোদিন দেখেননি। তালের চারা পাওয়া কঠিন।

নার্সারি বা বন বিভাগ এই চারা করে না। তাদের কাছে তালের আঁটি রয়েছে। অবশ্যই বজ্রপাতের এই রাঙা চাহনির মধ্যে এটি ভালো খবর। তা পরিণতি পাবে সত্যি সত্যি তালগাছগুলোকে মরতে না দিলে, বরাদ্দের টাকা নয়-ছয় না করলে।

লেখক: মোস্তফা কামাল, সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

(কলামটি ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে ‘বাংলা ট্রিবিউন’-এ  প্রকাশিত হওয়া কলামের অনুলিখন)



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top