ফ্যাসিবাদের বয়ান তৈরি করেছে সাংবাদিকদের একাংশ: ড. মাসউদ
নিজস্ব প্রতিনিধি: | প্রকাশিত: ৮ আগস্ট ২০২৬ ২১:১৪; আপডেট: ৮ আগস্ট ২০২৬ ২১:১৯
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ইফতেখারুল আলম মাসউদ বলেছেন, “বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে পেশাজীবীদের একটি বড় অংশ, সাংবাদিকসহ অনেকেই ফ্যাসিস্টদের গোলামি করেছে এবং তাদের পক্ষে বয়ান তৈরি করেছে। মাফিয়াদের দখলে থাকা সাংবাদিকরা হাসিনার উন্নয়নের জিকির এবং হাসিনাকে মানবতাবাদী হিসেবে উপস্থাপনের বয়ান গণমাধ্যমে তৈরি করেছিল।”
শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে রাজশাহীর একটি রেস্টুরেন্টে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন (আরইউজে) আয়োজিত ‘গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরাচার পতন: সাংবাদিক-পেশাজীবীদের লড়াই এবং পরবর্তী বাংলাদেশের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক মাসউদ বলেন, “স্বৈরাচার হাসিনা একটি প্রজন্ম ও তাদের চিন্তা-চেতনাকেও ধ্বংস করেছেন। তিনি ছিলেন পৃথিবীর নিকৃষ্টতম ফ্যাসিস্ট। এরপরও একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র তাকে আশ্রয় দিয়েছে। সেখানে দিনের পর দিন মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের নিরাপত্তার চাবিকাঠিসহ সবকিছু তিনি ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।”
তিনি বলেন, “১৯০৫ সালের পর এই ভূখণ্ডে আমরা অনেক বড় অর্জন পেয়েছি। ১৯৪৭ সালের পরও এ দেশের মানুষের বড় অর্জন ছিল। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হয়েও আমাদের কলকাতার জমিদারদের কাঁচামাল সরবরাহ করতে হতো। এ দেশে কোনো স্কুল ছিল না অপরদিকে রবীন্দ্রনাথের কাছারি ভবন দেখা যায়, কিন্তু তিনি কোনো স্কুল তৈরি করতে পারেননি।”
রাবি রেজিস্ট্রার আরও বলেন, “আমাদের চিন্তা-চেতনা এক। ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের মূল লক্ষ্য ছিল একটি ন্যায়-ইনসাফপূর্ণ সমাজব্যবস্থা এবং আমাদের জাতিসত্তার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। জুলাই আন্দোলনও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। তাই আমাদের পেশাজীবীদের আরও সোচ্চার হতে হবে, যাতে এ দেশে আর কোনো স্বৈরাচারের জন্ম না হয়।”
তিনি বলেন, “অনেক দেশে বিভিন্ন ধরনের সংবিধান রয়েছে। এরপরও সেখানে উগ্রবাদী জনগোষ্ঠীর উত্থান ঘটছে। এর কারণ আমাদের অনুসন্ধান করতে হবে। আজকে দেশের প্রধানমন্ত্রী মনে হচ্ছে একাই হয়ে গেছেন। বর্তমানে তিনি এমন এক ধরনের সহযোগী পেয়েছেন, যারা তাঁকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছেন।”
সভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শাহ হোসাইন আহমদ মেহেদী বলেন, “আমরা জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটিকে গণঅভ্যুত্থান বলা হচ্ছে, বিপ্লব বলা হচ্ছে না। অথচ একটি বিপ্লবের তিনটি শর্ত থাকতে হয় এবং জুলাই বিপ্লবের চিত্রে সেই তিনটি শর্তই উঠে এসেছিল।”
ড. শাহ মেহেদী বলেন, “দীর্ঘ ১৬ বছরের আওয়ামী লীগের দুঃশাসনে তাদের মতের সঙ্গে না মিললেই মানুষকে রাজাকার, জঙ্গি কিংবা বিভিন্ন অপবাদ দেওয়া হতো।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাই সনদে ২৬টি দল ঐকমত্য প্রকাশ করে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও ৭০ শতাংশ মানুষের গণভোটে বিজয়ী মতামত বাস্তবায়ন হয়নি। তাই জুলাইয়ের ধারায় পেশাজীবী ও সাধারণ জনগণসহ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আমাদের যথেষ্ট চেষ্টা থাকতে হবে।”
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহকারী মহাসচিব ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন। তিনি গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট, ভোটাধিকার হরণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয়, অর্থনৈতিক সংকট এবং পেশাজীবী ও সাংবাদিকদের ঐতিহাসিক ভূমিকা তুলে ধরেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতার রদবদল ছিল না; বরং এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ। ছাত্র-জনতার সঙ্গে আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের পেশাজীবীদের ইস্পাতকঠিন ঐক্যের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটে।
বক্তারা আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ভয়ের সংস্কৃতি ও গুমের অবসান ঘটেছে এবং বিচার বিভাগ, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধ, অপপ্রচার (ডিসইনফরমেশন) ও ‘মব কালচার’ বন্ধ, পেশাজীবী সংগঠনের দলীয়করণ রোধ এবং সংবাদমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মুহা. আব্দুল আউয়ালের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক ডালিম হোসেন শান্তর সঞ্চালনায় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কাশেম, লেখক ও গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গবেষক সরদার আব্দুর রহমান, কথাসাহিত্যিক ড. নাজিব ওয়াদুদ, ড্যাব রাজশাহীর সভাপতি ডা. ওয়াসিম হোসেন এবং রাজশাহী এডিটরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব অপু।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: